তলে তলে ক্ষয়ে গেছি আমরা!

প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম কোন্ মাদকদ্রব্য পাওয়া যায় না এই দেশে? নাম না জানা নতুন, নাম জানা পুরাতন, সব মাদকদ্রব্যের কোনটির চোরাচালান দেশে আসে, কোনটি দেশে উৎপন্ন হয়, কোনটি আমদানি করা হয়, কোনটি রপ্তানি হয়, কোনটি আন্তর্জাতিক রুট নিয়ে দেশের ভেতরে ঢুকে আবার বাইরে চলে যায়। সব ব্যবস্থাই প্রচলিত আছে এদেশে। শহর-গ্রাম গঞ্জ, হাট-বাজার, পথে, ঘাট-মাঠে, অলি-গলি, বিছানার তলা, বালিশের তুলা, জমির আইলের কোণা, মাছের ট্রাক, তরমুজ-লাউয়ের পেট, বস্তির ঝুপড়ি ঘর, বিলাসবহুল বাড়ি, কার, বাস, নৌকা, লঞ্চ, জাহাজ, বিমান, ড্রাইভার, পাইলট, ক্যাপ্টেন, সুকানী, মানুষের ব্যাগ, আলমারি, পকেট, পেট, মোজা, মলদ্বার-এমন কোন জায়গা বাকি নেই যেখানে মাদকদ্রব্য খুঁজে পাওয়া যায়নি। বা হরদম খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে ও ধরা পড়েও যাচ্ছে। বুলডোজার দিয়ে সেগুলো গুঁড়িয়ে দিয়ে ঘটা করে নিয়মিত টিভি পর্দাায় দেখানো হচ্ছে। মনে হয় তাতে কারো কোন বিকার নেই। এক সংবাদে জানা গেল বাংলাদেশে শতকরা ৩.৩ জন পূর্ণবয়স্ক মানুষ মাদকসেবী। অর্থাৎ, মাদকদ্রব্যের চাহিদা ব্যাপক। দেশের মোট জনসংখ্যা যদি ১৬ কোটি হয় এবং ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে জনসংখ্যার পরিমাণ ১১ কোটি হয় (জন ডিভিডেন্ট) তাহলে এক কোটিতে ৩ লাখ চল্লিশ হাজার একশত ষোলজন। তাহলে ১১ কোটিতে কতজন মাদকসেবী আছে? সাধারণ হিসেবে ধরা যায়, এই সংখ্যা পঁয়ত্রিশ লক্ষ সাতচল্লিশ হাজার আটান্ন জন! এতা গেল বড়দের কথা। ফেনসিডিল, খাট, ইয়াবা তো এখন উঠতি শিশু-কিশোরদের জনপ্রিয় মাদক। তাদেরকে হিসেবে আনলে এই সংখ্যা আরো ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে। অর্থ্যাৎ, এত বিপুল পরিমাণ জনগোষ্ঠী যেখানে মাদক সেবনে অভ্যস্ত সেখানে মাদকের একটি জমজমাট বাজার থাকা খুব স্বাভাবিক। উপরের তথ্যানুযায়ী গভীরভাবে অনুমান করলে যে কেউ উপলব্ধি করতে পারবেন যে- মাদকের কত বড় হাট-বাজার এখন আমাদের এই সুন্দর সুজলা সুফলা দেশ। অথচ, এখানে ধর্মীয়ভাবে মাদক হারাম বা নিষিদ্ধ। সামাজিকভাবে মাদকসেবীকে ঘৃণার চোখে দেখা হয়। শুধু বিদেশিদের জন্য বিশেষ জায়গা যেমন পাঁচতারা হোটেল ব্যতিত খোলা জায়গায় লাইসেন্স ছাড়া এর বেচা-কেনা নিষিদ্ধ। সেটাও আবার তরল মাদক বা পানীয় মাদক। কিন্তু কেন এমন হচ্ছে? আসলে মাদকসেবীর সংখ্যা দিন দিন বেড়ে যাওয়ায় এবং এর নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের কারো কারো মধ্যে অবৈধভাবে দ্রæত বড়লোক হবার ধান্ধা থাকায় এটাকে বন্ধ করা কঠিন ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। সারাদেশে মাদকের ব্যবসা করারা অবাধ ক্ষেত্র তৈরি হওয়ায় ব্রেনের চাহিদা তৈরি হয় এবং একসময় আসক্তি থেকে না পাবার বেদনায় নানা মানসিক বৈকল্য শুরু হতে থাকায় ভোক্তা চাহিদা শতগুণ বেড়ে যায় ও এর ফলে বাজারে চড়া মূল্য তৈরি হয়েছে। ফলে একজন বেকার যুবক বা কিশোরও এই ব্যবসা করতে প্রলুব্ধ হতে দ্বিধা বা ভয় করছে না। মানছে না কোন অনুশাসন। সবার চোখের সামনে এর কলকাঠি নিয়ন্ত্রণ করছে সমাজের বিভিন্ন পদবিধারী নামী-দামী বিত্তশালী মাফিয়া গোষ্ঠী। মাদক মাফিয়ার নিয়ন্ত্রণে এখন বাংলাদেশের বিশাল মাদকের হাট-বজারের মূল নিয়ন্ত্রণ। গত ১০ ফেব্রæয়ারী ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ইয়াবা মামলায় মা (ঝর্ণাা ৫৮) ও ছেলে (সুমন ২৮)-র দশ বছরের কারাদণ্ড হলো। তারা বাড়ির পাশে মাটি খুঁড়ে চল্লিশ হাজার পাঁচশত ইয়াবা পুঁতে রেখেছিল। কথা হলো- এদরকে এই নিষিদ্ধ ব্যবসায় নামালো কে? ইয়াবা সরবরাহ করলো কারা? মাফিয়া সাংসদ বা ভুঁড়িওয়ালা নেপথ্যের বড়ভাইটি কে? পুলিশ সেকথা নিশ্চয়ই জানেন। তারা তো ধরা পড়লো না, তাদের তো জেল হলো হলো না, তাদের নাম পত্রিকায় এলোনা, জনগণ তাদের বিএমডবিøউ, ক্যাডিলাক, বালাখানা ইত্যাদির জৌলুষের বাহার দেখে অভ্যস্ত কিন্তু অন্ধকার জগতের কথা জানতে পারে না কেন? এদেশে অন্ধকার জগতের ব্যবসা তাহলে কাদের নিয়ন্ত্রণে? রমনা পার্কের ইয়াবা পুড়িয়া বিক্রিওয়ালার কান ধরে থানায় নেয়া হয়। ওদের নিয়োগ কর্তাদেরকে ধরা হয় না কেন? এভাবে আর কতদিন চলবে? আমরা তলে তলে ক্ষয়ে পঁচে গিয়েছি। সমাজের এই পঁচন রোধ করার দায়িত্ব তাহলে কাদের? বগুড়ায় রেক্টিফাইড স্পিরিট খেয়ে ১৫ জন প্রাণ হারালো, গতবছর গাইবান্ধায় রেক্টিফাইড স্পিরিট খেয়ে মৃতদের স্বজনরা জানায় সেগুলোর সরবরাহকারি প্রতিষ্ঠানও ওই গ্রæপ্রের লোকজন। সরকারকে ট্যাক্স দিয়েই স্পিরিট-এর উৎপাদন ও ব্যবসা পরিচালিত হয। রেক্টিফাইড স্পিরিট হোমিও ওষুধ ও অন্যান্য চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন। সেগুলো খাবারের জন্য মানুষের হাতে যায় কীভাবে? খোলা বাজারে বিক্রি হয় কীভাবে? নিশ্চই সরকারি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগসাজশ করে সেটা করা হয়। চোরে চোরে মাসতুতো ভায়েরা এখন শুধু লোকাল নয়- আন্তর্জাাতিক মাফিয়াদের হয়ে দেশের পবিত্র ভূমিকে অপবিত্র করে তুলেছে। সেদিন বিজিবি-র তাড়া খেয়ে নাফ নদীতে লাফ দিল ইয়াবা ব্যবসায়ী। ওরা তিনকোটি পিস ইয়াবা ও এগার লক্ষ বোতল ফেনসিডিল চালান নিয়ে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আসছে জেনে বিজিবি ওদের নৌকাকে তাড়া করলে এক ব্যবসায়ী নদীতে লাফ দেয়। বিজিবি সদস্যরাও ওর পিছনে লাফিয়ে সাঁতার দিয়ে ধরে ফেলে। পরে ওদের বাড়ি থেকে দুই বস্তা ইয়াবা ও একবস্তা টাকা উদ্ধার করা হয। এগুলো নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা। এত অবৈধ টাকার জন্য সে এলাকার মানুষ নিজেদেরকে ধনী মনে করে। তাই সেসব জেলা-উপজেলায় পোস্টিং নেয়ার জন্য সরকারি লোকেরা কোটি টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে রাজি থাকে বলে হীন প্রতিযোগিতার কথা শোনা যায়। বাংলাদেশ বিশে^র বড় মাদক রুটই শুধু নয়- বড় মাদক বাজার। সবচে আতঙ্কের বিষয় হলো- আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে দিন দিন মাদকাসক্তির হার বেড়ে চলেছে। তারা কেউ আসক্ত হয়ে এর অবৈধ ব্যবসায় নেমে পড়েছে। তাদের চিহ্নিত করতে ডোপ টেস্ট করা হচ্ছে। নমুনা পজিটিভ হয়ে অনেকের চাকুরিও চলে গেছে। কারো বিদায় চলছে। পরিচ্ছন্ন করা হচ্ছে ওদের নিজেদের অঙ্গনকে। পাশাপাশি বিভিন্ন অভিযান চলছে হরদম। ২০২০ সালে মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান বেশি, কর্মকান্ড বেশি, উদ্ধার বেশি, গ্রেফতারও বেশি হয়েছে। এ পর্যন্ত ১ লক্ষ একত্রিশ হাজার ৩৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ডগ স্কয়াড দিয়ে উদ্ধার তৎপরতা চালানো হলেও সেটা বড় অপ্রতুল। এত বড় সীমান্তে মাদক শুঁকতে কতগুলো ডগস্কয়াড লাগবে তার হিসাব কি এত সহজ? আজকাল মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের লোকদেরকে ভয় দেখানোর জন্য ইয়াবার প্যাক

তলে তলে ক্ষয়ে গেছি আমরা!

প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম

কোন্ মাদকদ্রব্য পাওয়া যায় না এই দেশে? নাম না জানা নতুন, নাম জানা পুরাতন, সব মাদকদ্রব্যের কোনটির চোরাচালান দেশে আসে, কোনটি দেশে উৎপন্ন হয়, কোনটি আমদানি করা হয়, কোনটি রপ্তানি হয়, কোনটি আন্তর্জাতিক রুট নিয়ে দেশের ভেতরে ঢুকে আবার বাইরে চলে যায়। সব ব্যবস্থাই প্রচলিত আছে এদেশে।

শহর-গ্রাম গঞ্জ, হাট-বাজার, পথে, ঘাট-মাঠে, অলি-গলি, বিছানার তলা, বালিশের তুলা, জমির আইলের কোণা, মাছের ট্রাক, তরমুজ-লাউয়ের পেট, বস্তির ঝুপড়ি ঘর, বিলাসবহুল বাড়ি, কার, বাস, নৌকা, লঞ্চ, জাহাজ, বিমান, ড্রাইভার, পাইলট, ক্যাপ্টেন, সুকানী, মানুষের ব্যাগ, আলমারি, পকেট, পেট, মোজা, মলদ্বার-এমন কোন জায়গা বাকি নেই যেখানে মাদকদ্রব্য খুঁজে পাওয়া যায়নি। বা হরদম খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে ও ধরা পড়েও যাচ্ছে। বুলডোজার দিয়ে সেগুলো গুঁড়িয়ে দিয়ে ঘটা করে নিয়মিত টিভি পর্দাায় দেখানো হচ্ছে। মনে হয় তাতে কারো কোন বিকার নেই।

এক সংবাদে জানা গেল বাংলাদেশে শতকরা ৩.৩ জন পূর্ণবয়স্ক মানুষ মাদকসেবী। অর্থাৎ, মাদকদ্রব্যের চাহিদা ব্যাপক। দেশের মোট জনসংখ্যা যদি ১৬ কোটি হয় এবং ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে জনসংখ্যার পরিমাণ ১১ কোটি হয় (জন ডিভিডেন্ট) তাহলে এক কোটিতে ৩ লাখ চল্লিশ হাজার একশত ষোলজন। তাহলে ১১ কোটিতে কতজন মাদকসেবী আছে? সাধারণ হিসেবে ধরা যায়, এই সংখ্যা পঁয়ত্রিশ লক্ষ সাতচল্লিশ হাজার আটান্ন জন! এতা গেল বড়দের কথা।

ফেনসিডিল, খাট, ইয়াবা তো এখন উঠতি শিশু-কিশোরদের জনপ্রিয় মাদক। তাদেরকে হিসেবে আনলে এই সংখ্যা আরো ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে। অর্থ্যাৎ, এত বিপুল পরিমাণ জনগোষ্ঠী যেখানে মাদক সেবনে অভ্যস্ত সেখানে মাদকের একটি জমজমাট বাজার থাকা খুব স্বাভাবিক।

উপরের তথ্যানুযায়ী গভীরভাবে অনুমান করলে যে কেউ উপলব্ধি করতে পারবেন যে- মাদকের কত বড় হাট-বাজার এখন আমাদের এই সুন্দর সুজলা সুফলা দেশ। অথচ, এখানে ধর্মীয়ভাবে মাদক হারাম বা নিষিদ্ধ। সামাজিকভাবে মাদকসেবীকে ঘৃণার চোখে দেখা হয়। শুধু বিদেশিদের জন্য বিশেষ জায়গা যেমন পাঁচতারা হোটেল ব্যতিত খোলা জায়গায় লাইসেন্স ছাড়া এর বেচা-কেনা নিষিদ্ধ। সেটাও আবার তরল মাদক বা পানীয় মাদক। কিন্তু কেন এমন হচ্ছে?

আসলে মাদকসেবীর সংখ্যা দিন দিন বেড়ে যাওয়ায় এবং এর নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের কারো কারো মধ্যে অবৈধভাবে দ্রæত বড়লোক হবার ধান্ধা থাকায় এটাকে বন্ধ করা কঠিন ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। সারাদেশে মাদকের ব্যবসা করারা অবাধ ক্ষেত্র তৈরি হওয়ায় ব্রেনের চাহিদা তৈরি হয় এবং একসময় আসক্তি থেকে না পাবার বেদনায় নানা মানসিক বৈকল্য শুরু হতে থাকায় ভোক্তা চাহিদা শতগুণ বেড়ে যায় ও এর ফলে বাজারে চড়া মূল্য তৈরি হয়েছে। ফলে একজন বেকার যুবক বা কিশোরও এই ব্যবসা করতে প্রলুব্ধ হতে দ্বিধা বা ভয় করছে না। মানছে না কোন অনুশাসন। সবার চোখের সামনে এর কলকাঠি নিয়ন্ত্রণ করছে সমাজের বিভিন্ন পদবিধারী নামী-দামী বিত্তশালী মাফিয়া গোষ্ঠী।

মাদক মাফিয়ার নিয়ন্ত্রণে এখন বাংলাদেশের বিশাল মাদকের হাট-বজারের মূল নিয়ন্ত্রণ। গত ১০ ফেব্রæয়ারী ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ইয়াবা মামলায় মা (ঝর্ণাা ৫৮) ও ছেলে (সুমন ২৮)-র দশ বছরের কারাদণ্ড হলো। তারা বাড়ির পাশে মাটি খুঁড়ে চল্লিশ হাজার পাঁচশত ইয়াবা পুঁতে রেখেছিল। কথা হলো- এদরকে এই নিষিদ্ধ ব্যবসায় নামালো কে? ইয়াবা সরবরাহ করলো কারা? মাফিয়া সাংসদ বা ভুঁড়িওয়ালা নেপথ্যের বড়ভাইটি কে? পুলিশ সেকথা নিশ্চয়ই জানেন। তারা তো ধরা পড়লো না, তাদের তো জেল হলো হলো না, তাদের নাম পত্রিকায় এলোনা, জনগণ তাদের বিএমডবিøউ, ক্যাডিলাক, বালাখানা ইত্যাদির জৌলুষের বাহার দেখে অভ্যস্ত কিন্তু অন্ধকার জগতের কথা জানতে পারে না কেন? এদেশে অন্ধকার জগতের ব্যবসা তাহলে কাদের নিয়ন্ত্রণে? রমনা পার্কের ইয়াবা পুড়িয়া বিক্রিওয়ালার কান ধরে থানায় নেয়া হয়। ওদের নিয়োগ কর্তাদেরকে ধরা হয় না কেন? এভাবে আর কতদিন চলবে? আমরা তলে তলে ক্ষয়ে পঁচে গিয়েছি। সমাজের এই পঁচন রোধ করার দায়িত্ব তাহলে কাদের?

বগুড়ায় রেক্টিফাইড স্পিরিট খেয়ে ১৫ জন প্রাণ হারালো, গতবছর গাইবান্ধায় রেক্টিফাইড স্পিরিট খেয়ে মৃতদের স্বজনরা জানায় সেগুলোর সরবরাহকারি প্রতিষ্ঠানও ওই গ্রæপ্রের লোকজন। সরকারকে ট্যাক্স দিয়েই স্পিরিট-এর উৎপাদন ও ব্যবসা পরিচালিত হয। রেক্টিফাইড স্পিরিট হোমিও ওষুধ ও অন্যান্য চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন। সেগুলো খাবারের জন্য মানুষের হাতে যায় কীভাবে? খোলা বাজারে বিক্রি হয় কীভাবে? নিশ্চই সরকারি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগসাজশ করে সেটা করা হয়। চোরে চোরে মাসতুতো ভায়েরা এখন শুধু লোকাল নয়- আন্তর্জাাতিক মাফিয়াদের হয়ে দেশের পবিত্র ভূমিকে অপবিত্র করে তুলেছে।

সেদিন বিজিবি-র তাড়া খেয়ে নাফ নদীতে লাফ দিল ইয়াবা ব্যবসায়ী। ওরা তিনকোটি পিস ইয়াবা ও এগার লক্ষ বোতল ফেনসিডিল চালান নিয়ে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আসছে জেনে বিজিবি ওদের নৌকাকে তাড়া করলে এক ব্যবসায়ী নদীতে লাফ দেয়। বিজিবি সদস্যরাও ওর পিছনে লাফিয়ে সাঁতার দিয়ে ধরে ফেলে। পরে ওদের বাড়ি থেকে দুই বস্তা ইয়াবা ও একবস্তা টাকা উদ্ধার করা হয। এগুলো নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা। এত অবৈধ টাকার জন্য সে এলাকার মানুষ নিজেদেরকে ধনী মনে করে। তাই সেসব জেলা-উপজেলায় পোস্টিং নেয়ার জন্য সরকারি লোকেরা কোটি টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে রাজি থাকে বলে হীন প্রতিযোগিতার কথা শোনা যায়।

বাংলাদেশ বিশে^র বড় মাদক রুটই শুধু নয়- বড় মাদক বাজার। সবচে আতঙ্কের বিষয় হলো- আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে দিন দিন মাদকাসক্তির হার বেড়ে চলেছে। তারা কেউ আসক্ত হয়ে এর অবৈধ ব্যবসায় নেমে পড়েছে। তাদের চিহ্নিত করতে ডোপ টেস্ট করা হচ্ছে। নমুনা পজিটিভ হয়ে অনেকের চাকুরিও চলে গেছে। কারো বিদায় চলছে। পরিচ্ছন্ন করা হচ্ছে ওদের নিজেদের অঙ্গনকে।

পাশাপাশি বিভিন্ন অভিযান চলছে হরদম। ২০২০ সালে মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান বেশি, কর্মকান্ড বেশি, উদ্ধার বেশি, গ্রেফতারও বেশি হয়েছে। এ পর্যন্ত ১ লক্ষ একত্রিশ হাজার ৩৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ডগ স্কয়াড দিয়ে উদ্ধার তৎপরতা চালানো হলেও সেটা বড় অপ্রতুল। এত বড় সীমান্তে মাদক শুঁকতে কতগুলো ডগস্কয়াড লাগবে তার হিসাব কি এত সহজ?

আজকাল মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের লোকদেরকে ভয় দেখানোর জন্য ইয়াবার প্যাকেটের সাথে অত্যাধুনিক অস্ত্র রেখে দেয়া হচ্ছে। কারণ, তাদের ঢাল-তলোয়ার নেই। তারা খালি হাতে ইয়াবা চোরদের ধরতে যান। এটাও বেশ ভয়ংকর অভিযান। এদের নিরাপত্তা দেয়া জরুরি।

দেশে মাদকের বাজার ও ভোক্তা দিন দিন বেড়ে চলেছে। দেশ ও সমাজ নয়- মাদক এখন পরিবারের জন্য ত্রাস। লক্ষ লক্ষ পরিবার এখন মাদকের করাল গ্রাসে ছিন্ন ভিন্ন হয়ে গেছে। অনেকে লজ্জায় সেকথা কাউকে বলতে না পেরে শুধু কেঁদে-কেটে লুকিয়ে থাকেন। এমন কঠিন বাস্তবতা-এটা তো একটি স্বাধীন দেশের প্রকৃতি হতে পারে না।

বাজারে মাদক পাওয়া গেলে ছেলেরা কেন চা-বিস্কুট-মিষ্টি খেতে আগ্রহী হবে? এগুলো তো নেশা করে না। নিষিদ্ধ দ্রব্যের প্রতি কম বয়সীদের কৌতুহল ও আগ্রহ বেশি। এছাড়া রয়েছে বন্ধু-বান্ধবদের পীড়াপীড়ি। এভাবে নিষিদ্ধ মাদকে একদিন হাতেখড়ি হয়ে যায়। আর এতেই কয়েকদিনের মধ্যে সর্বনাশা ক্ষেত্র তৈরি হওয়ায় ব্রেনের চাহিদা তৈরি হয় এবং একসময় আসক্তি চলে আসে। তখন আর ঠেকায় কে? বাবা-মা-বন্ধু সবাই নিরুপায় হয়ে যায়।

তাই কাছের মানুষের দিকে নজর রাখুন। আদরের সন্তানটিকে আগলে রাখার দায়িত্ব আমার আপনার সবার। সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো এ বিষয়ে দেশের সেবাদানকারীদের। সেবাদাতাদের সকল ক্ষতিকর কাজ সম্পর্কে আগেভাগে জানতে হবে। সেজন্য বকলম সোর্স নিয়োগ বন্ধ করে বিসিএস পাশদেরকেই চৌকষ সোর্সের দায়িত্ব পালন করতে হবে।

আমরা প্রতিবার কোন বিপদ ঘটে যাবার পর জানতে পারি, আগে জানি না কেন? অথবা আগে জানলেও প্রতিকার না করে মুখ বুজে থাকি কেন? দেখে না দেখার ভান করলে অথবা নিজের দায়িত্বে অবহেলা করতে থাকলে আমরা সবাই এর ভুক্তভোগী হয়ে যাব। তখন তলে তলে দিন দিন আরো ক্ষয়ে গিয়ে নিঃশেষ হয়ে যেতে পারি অচিরেই।

লেখক : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।
fakrul@ru.ac.bd

এইচআর/এমএস