প্রেমিককে খুনের এক দশক পর প্রেমিকা গ্রেফতার!

কলকাতায় ১০ বছর আগের এক খুনের ঘটনায় নিহত যুবকের ‘প্রেমিকা’কে গ্রেফতার করল ভারতের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিবিআই। গ্রেফতার প্রিয়াঙ্কা চৌধুরী মোহনবাগান ক্লাবের একজন প্রাক্তন কর্মকর্তার পুত্রবধূ। নিহত যুবকের নাম জুনিয়র মৃধা বলে জানায় পশ্চিমবঙ্গের দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা।

প্রেমিককে খুনের এক দশক পর প্রেমিকা গ্রেফতার!
দেহটা পড়েছিল রাস্তার ধারে। প্রথমে মনে হয়েছিল দুর্ঘটনা। পরে তদন্তে জানা যায় গুলি করে খুন। সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার জুনিয়র মৃধা খুনের সেই ঘটনার ৯ বছর পর সোমবার গ্রেফতার করা হল তাঁরই বান্ধবী প্রিয়াঙ্কা চৌধুরীকে। সংবাদ শিরোনামে উঠে এসেছেন প্রিয়াঙ্কা। সুত্র ও ছবি আনন্দ বাজার পত্রিকা 

জুনিয়র খুনের তদন্তকারীরা জানাচ্ছেন, ২০০৮ সালে ফেসবুকে জুনিয়রের সঙ্গে আলাপ হয় প্রিয়াঙ্কা চৌধুরীর। মডেল বলে নিজের পরিচয় দেন প্রিয়াঙ্কা। টলিউডের সিনেমা বা সিরিয়াল কোনও ক্ষেত্রেই প্রিয়াঙ্কার কোনও পরিচয় নেই। কিন্তু অনেক টলি-পরিচালক বা প্রযোজকের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতার তথ্য পুলিশের হাতে রয়েছে।

ফেসবুকে আলাপ জমানোর পর পরই জুনিয়রের বাড়িতে যাতায়াত শুরু করেন প্রিয়াঙ্কা। তাঁদের মধ্যে সম্পর্ক এতটাই এগোয় যে জুনিয়রের পারিবারিক অনুষ্ঠানেও যাতায়াত শুরু করেন তিনি। কিন্তু পুলিশের দাবি, জুনিয়রের সঙ্গে সম্পর্ক থাকাকালীনই আরও একাধিক ঘনিষ্ঠতায় প্রিয়াঙ্কা জড়িয়ে ছিলেন।

প্রিয়াঙ্কা ওরফে মুন তখন মোহনবাগান ক্লাবের প্রাক্তন এক কর্তা তথা শিল্পপতির পূত্রবধূ। কিন্তু জুনিয়র বা তাঁর পরিবারের কাছে নিজের বিবাহিত পরিচয় পুরোপুরি গোপন করে যান তিনি।

প্রিয়াঙ্কা এবং জুনিয়রের মেলামেশাকে সামাজিক বন্ধনের পরিণতি দিতে আপত্তি ছিল না ওই সফ্টওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারের পরিবারের। দু’জনের বিয়ের পরিকল্পনাও সেরে ফেলেছিলেন জুনিয়রের অভিভাবকরা।

মোবাইলের কল রেকর্ড দেখে এবং প্রিয়াঙ্কার বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে কথা বলে তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন, ২০১০ থেকে ২০১২ সাল টলিপাড়ার বেশ কয়েক জনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল। জুনিয়রের সঙ্গে সম্পর্ক থাকাকালীন তো বটেই, তাঁর খুনের পরও সে সম্পর্ক ছিল।

জুনিয়রের পরিবারের দাবি, বিয়ের পরিকল্পনার সময়ই টলিউডের এক উঠতি প্রযোজকের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল প্রিয়াঙ্কার। তিনি নাকি সে বিষয়টি পুরোপুরি গোপন রেখেই জুনিয়রের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ করতেন। তবে পরে তা জানাজানি হয়।

জুনিয়র খুন হওয়ার কয়েক মাস আগে আচমকাই প্রিয়াঙ্কার বিবাহিত পরিচয় জেনে যান জুনিয়রের বাড়ির লোকেরা। একটি জনপ্রিয় টেলিভিশন শো-তে শাঁখা-সিঁদুর পরা প্রিয়াঙ্কাকে দেখে হতবাক হয়ে যান তাঁরা। ওই অনুষ্ঠানে নিজের শ্বশুরবাড়ির সম্পর্কে কথা বলছিলেন প্রিয়াঙ্কা। ওই ঘটনার পর জুনিয়রের সঙ্গে সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে চেয়েছিলেন প্রিয়াঙ্কা।

তদন্তকারীদের দাবি, ২০১১ সালের ১২ জুলাই জুনিয়রের দেহ উদ্ধারের দিন তাঁর সঙ্গে ২১ বার কথা হয়েছিল প্রিয়াঙ্কার। কথা হয়েছিল খুন হওয়ার কিছুক্ষণ আগেও। আবার ওই দিনই টালিগঞ্জের একাধিক প্রযোজক-পরিচালকের সঙ্গে প্রিয়াঙ্কার প্রায় দু’শো বার কথা হয়েছিল বলে জানতে পেরেছেন তদন্তকারীরা।

২০১৯ সালে কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে জুনিয়র হত্যার তদন্তের ভার নেয় সিবিআই। প্রিয়াঙ্কার কল রেকর্ড খুঁটিয়ে পরীক্ষা করে এই মামলায় বহু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হাতে এসেছে বলে জানাচ্ছেন তদন্তকারীরা।

খুনের দিন এত বার ফোনের বিষয়টা জোরাল সন্দেহ জাগায় তদন্তকারীদের মনে। প্রিয়াঙ্কাকে ডেকে জেরা চলতে থাকে। তবে খুনের অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি। গত রবিবার তৃতীয় বার সিবিআই অফিসে ডেকে জেরা হয়। ৮ ঘণ্টা জেরার পর তাঁকে গ্রেফতার করা হয়।

ফোনের সূত্র ধরে তরুণ সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার জুনিয়রের সঙ্গে প্রিয়াঙ্কার যোগাযোগের সূত্র সামনে আসে। জুনিয়রের পরিবারের দাবি, ঘটনার দিন দুপুরে ফোনে প্রিয়াঙ্কার ডাক পেয়েই জুনিয়র বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন।

প্রিয়াঙ্কার আইনজীবী অয়ন চক্রবর্তী অবশ্য দাবি করেন, আমার মক্কেল খুনে জড়িত নন। তিনি তদন্তে সহযোগিতা করছিলেন। 

এর আগে রাজ্য পুলিশ এই খুনের নিষ্পত্তি করতে পারবে না বলে রাজ্য আইনি পরিষেবা কর্তৃপক্ষের কাছে গিয়েছিলেন জুনিয়রের আত্মীয়রা। তাদের হয়ে হাইকোর্টে মামলাটি লড়েন জয়ন্তনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়। তিনি বলেন, দেরিতে হলেও জুনিয়রের মা-বাবা সুবিচার পাওয়ার পথে একধাপ এগিয়ে গেল।

সুত্রঃ আনন্দ বাজার পত্রিকা