বাংলাদেশে তেলুগু: বিলুপ্তির পথে মাতৃভাষা, জীবনেরও নেই রূপান্তর

ভাষা একটি জাতিগোষ্ঠীর পরিচয় বহন করে। জাতির আয়না হিসেবে তার আত্মপরিচয়কে বিশ্বের সামনে স্বকীয় করে তোলে। বাংলাদেশ পৃথিবীর একমাত্র রাষ্ট্র যারা মাতৃভাষার জন্য রক্ত দিয়েছে, জীবন দিয়েছে।  ...

বাংলাদেশে তেলুগু: বিলুপ্তির পথে মাতৃভাষা, জীবনেরও নেই রূপান্তর
ভাষা একটি জাতিগোষ্ঠীর পরিচয় বহন করে। জাতির আয়না হিসেবে তার আত্মপরিচয়কে বিশ্বের সামনে স্বকীয় করে তোলে। বাংলাদেশ পৃথিবীর একমাত্র রাষ্ট্র যারা মাতৃভাষার জন্য রক্ত দিয়েছে, জীবন দিয়েছে।  রক্তের দামে মায়ের ভাষা, বাংলা ভাষা রক্ষা করেছে। বাংলাভাষি মানুষের পাশাপাশি বহু ভাষাভাষি মানুষ রয়েছে এ রাষ্ট্রে। আবার অনেক ভাষার বর্ণমালাও নেই, শুধু কথ্য রূপে চলছে। বাঙালি, অবাঙালি নৃগোষ্ঠীর পাশাপাশি বহুকাল ধরে দলিত জনগোষ্ঠীর তেলুগু ভাষিরাও বসবাস করছে এ দেশে। দেশের অনগ্রসর ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে তেলুগু সম্প্রদায় একটি।

জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায় ২ লাখ তেলুগু ভাষার জনগোষ্ঠী রয়েছে। তেলুগু ভাষি সম্প্রদায়ের একটি বিশাল অংশ বাস করে সিলেটে। সিলেটের শমসেরনগর চা বাগান, পাত্রখোলা চা বাগান, দলই চা বাগান, রাজঘাট চা বাগানে তারা চা-শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। যশোর, পাবনার ঈশ্বরদী ও পাকশী রেলওয়ে কলোনিতেও রয়েছেন তেলুগু ভাষায় মানুষ। তারা পৌরসভা ও রেলওয়ে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করেন।

এছাড়া রাজধানীর বঙ্গভবন স্টাফ কোয়ার্টার, দয়াগঞ্জ, ১৪ নং আউটফল ধলপুর, যাত্রাবাড়ী মাছের আঁড়ৎ,  গোপীবাগ রেলওয়ে কলোনি, ধলপুর মাতৃসদনের পাশাপাশি পঙ্গু পিডাব্লিউ কলোনি, গাবতলী বেড়িবাঁধ এলাকায়ও তেলুগু সম্প্রদায়ের লোকজনের বসবাস রয়েছে। তাদের বেশিরভাগেই পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করে।

প্রায় দেড়শ বছর আগে ব্রিটিশ আমলে তেলুগুদের একটি বড় অংশ বাংলাদেশে আসে। ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় দক্ষিণ ভারত থেকে তেলুগুরা এদেশে পাড়ি জমায়। ব্রিটিশ আমলে চা-বাগান, সিটি করপোরেশন ও রেলওয়েতে কাজের সুযোগ পায় তারা। ঢাকায় অবস্থানকারী তেলুগুরা ঢাকা সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে এ পেশায় নিয়োজিত। কর্মব্যস্ত দিনের শুরুতে আবর্জনামুক্ত যে ঢাকা শহর আমরা দেখি, তা অনেকাংশে তেলুগুদেরই অবদান। ঢাকার তেলুগুরা এ কাজটি করে আসছে ১৮৬৪ সাল থেকে, ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটি স্থাপন হওয়ার পরপরই।

দীর্ঘকাল ধরে তেলুগু সম্প্রদায়ের এ বিশেষ জনগোষ্ঠী এদেশের নাগরিক হলেও জন্ম ও পেশাগত পরিচয়ের কারণে বৈষম্য ও বঞ্চনার শিকার হচ্ছে। বিশেষ করে হুমকির মুখে রয়েছে তাদের মাতৃভাষা। তেলুগুরা ভালো বাংলায়ও কথা বলতে পারে না। তেলুগুদের শিক্ষার অবস্থা খুবই করুণ। হাতেগোনা কয়েকজন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লেও ঝরেপড়া শিক্ষার্থীর হারই বেশি। এর পেছনে অর্থনৈতিক কারণ ছাড়াও অন্যতম প্রধান কারণ ভাষাগত। তেলুগু সম্প্রদায় নিজেদের মধ্যে তেলুগু ভাষায় কথা বলে। এই ভাষায় ৬০টি বর্ণমালা আছে। তার মধ্যে ৪১টি স্বরবর্ণ, ১৬টি ব্যঞ্জনবর্ণ ও ৩টি পরিবর্তনকারী বর্ণ রয়েছে।  

২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতির ১৮, ১৯, ২০ ধারা যেখানে ‘আদিবাসী’ শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষার অধিকারের বিষয়টি স্পষ্টভাবে বলা হলেও দলিত জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষার কথা উল্লেখ নেই।

পৃথিবীর বিকাশমান ও বিলুপ্তপ্রায় ভাষাগুলির মর্যাদা ও অধিকার রক্ষায় গবেষণার জন্য আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট রয়েছে দেশ। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মাতৃভাষা সংরক্ষণে কাজ করলেও দলিত জনগোষ্ঠীর তেলুগু সম্প্রদায়ের মাতৃভাষা সংরক্ষণে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট উদাসীন।

এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের পরিচালক প্রফেসর মো. শাফীউল মুজ নবীন ব্রেকিংনিউজকে বলেন, ‘বাংলা ভাষার বাহিরে ৪০টি ভাষার সার্ভে করেছি আমরা। দলিত জনগোষ্ঠীর তেলুগু সম্প্রদায়ের মাতৃভাষা সংরক্ষণেও আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে। আমরা পর্যায়ক্রমে তাদের জন্যও কাজ করবো।’

এ বিষয়ে বাংলাদেশ অনগ্রসর জনগোষ্ঠী উন্নয়ন ফোরামে সদস্য সচিব যোশেফ ( ইউ,কে, নন্দম - জয়) ব্রেকিংনিউজকে বলেন, ‘তেলুগুরা এদেশে নানা ধরণের বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। তেলুগু সম্প্রদায়ের নিজস্ব ভাষা ও বর্ণমালা থাকলেও সরকার বরাবরই এ ভাষা সংরক্ষণে উদাসীন।’

অন্যান্য নৃগোষ্ঠীর মাতৃভাষা সংরক্ষণে সরকার যেভাবে পদক্ষেপ নিয়েছে, তেলুগু সম্প্রদায়ের মাতৃভাষা সংরক্ষণেও সেরকম প্রয়োজনী ব্যবস্থা গ্রহণ এবং প্রাইমারি লেভেল পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় তেলুগু স্কুল নির্মাণ, তেলুগু শিক্ষক নিয়োগসহ তেলুগু ভাষায় পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নের দাবি জানান যোশেফ।

ব্রেকিংনিউজ/আরএইচ/এমআর