ভাষার প্রসার এবং অনুবাদ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘‘অনুবাদচর্চ্চা’’ নামে একটি বই আছে সেখানে শিক্ষার্থীদের অনুবাদ শিক্ষা দেওয়ার জন্য শিক্ষকদের প্রতি ভূমিকাংশে বেশ কিছু নির্দেশনা বর্ণিত হয়েছে। তিনি মনে করতেন, ইংরেজি থেকে বাংলা অনুবাদ অত্যন্ত দুঃসাধ্য। তবে তিনি বিশ্বাস করতেন, ‘যদি যথোচিত অধ্যবসায়ের সঙ্গে অন্তত দুই বৎসর কাল এই অনুবাদ প্রত্যনুবাদের পন্থা ধরে ভাষাব্যবহারের অভ্যাস ঘটানো যায় তা হলে ইংরেজি ও বাংলা দুই ভাষাতেই দখল জন্মানো সহজ হবে। বিদেশী ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে অনুবাদ যে উৎকৃষ্ট পন্থা তা তিনি স্পষ্ট করেছিলেন এভাবে-‘দুই সম্পূর্ণ বিভিন্ন ভাষার মধ্যে কথায় কথায় অনুবাদ চলতেই পারে না। ইংরেজি ও বাংলা দুই ভাষায় প্রকাশের প্রথা স্বতন্ত্র এবং পরস্পরের মধ্যে শব্দ ও প্রতিশব্দের অবিকল মিল পাওয়া অসম্ভব, এই কথাটি তর্জ্জমা করতে গিয়ে যতই আমাদের কাছে ধরা পড়ে ততই উভয় ভাষার প্রকৃতি স্পষ্ট করে বুঝতে পারি। এই জন্যে অনুবাদের যোগে বিদেশী ভাষাশিক্ষার প্রণালীকে আমি প্রশস্ত বলে মনে করি।’ ভাষা শিক্ষার প্রণালি হিসেবে অনুবাদের গুরুত্ব আমাদের দেশে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের দীর্ঘ সাত দশক পরও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তবে ২০২০ সালের বইমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘অমর একুশে বইমেলার মধ্য দিয়ে আমাদের শিল্প-সংস্কৃতিকে কেবল বাংলাদেশের মধ্যেই নয়, বিশ্ব দরবারে পৌঁছাতে চাই।’ এর আগেও তিনি অনুবাদের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন একাধিক অনুষ্ঠানের বক্তব্যে। ফলে সম্প্রতি বাংলা একাডেমি ‘অনুবাদ’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছে এবং অনূদিত পাঠ্যপুস্তক প্রকাশে সক্রিয় হয়েছে। অন্যদিকে ১৮ ফেব্রæয়ারি(২০২১) বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ‘আমার ভাষা’ নামে একটি অনুবাদ সফটওয়্যার উদ্বোধন করেছে। এই সফটওয়্যার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে সুপ্রিম কোর্টের আদেশ ও রায়গুলি ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করতে সক্ষম। অর্থাৎ অনুবাদের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষা প্রসারিত হওয়া শুরু হয়েছে ক্রমান্বয়ে। অবশ্য বাংলা সাহিত্যের আধুনিক কবি-সাহিত্যিকরা অনুবাদের অনলস ভোক্তা, উপরন্তু নিজেরাও অনুবাদক। অনুবাদও একটি সপ্রাণ, সংক্রামক, মূল্যবান সাহিত্যকর্ম, এবং কখনো-কখনো তা সৃষ্টিকর্মেরও মর্যাদা পায়। অনুবাদ সম্পর্কে কবি-কথাসাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ‘অন্যদেশের কবিতা’ গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেছেন- ‘মূল ভাষা না জেনে অনুবাদ করার প্রচেষ্টা গুরুতর ধৃষ্টতা বা অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। কিন্তু এ জন্য আমি নিজেকে তেমন অপরাধী মনে করি না, তার প্রথম ছোট কারণ শব্দের সৌকুমার্য যখন ভাষান্তরিত করা অসম্ভব, তখন মূল ভাষা জানার প্রশ্ন তেমন জরুরি নয়, দ্বিতীয়ত, আমার আগে এই ধরনের অনুবাদের কাজ বাংলাদেশে করেছেন আরও অন্ততঃ পঞ্চাশ জন কবি, যাদের শিরোভাগে আছেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ।’ বাংলা কবিতায় অনুবাদ চর্চা বেগবান হয়েছে এই অনিবার্য দূরত্বকে স্বীকার করে নিয়ে। এই দূরত্ব দূর করতে পারা গেলে অনুবাদেও এক গুণগত পরিবর্তন আসবে, এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। মূল কবিতার শব্দে অর্থের যে ব্যঞ্জনা, অনুবাদক তাতে নানা ভাবে সাড়া দিয়ে থাকেন, কারণ অনেক শব্দই একার্থক নয়। বিশেষ অনুবাদে তার একটি অর্থই ধরা পড়ে, ব্যঞ্জনার বাকিটুকু মূল ভাষার সঙ্গে পরিচয় না হলে চিরদিন অজানা থেকে যায়। শব্দার্থগত দিক ছাড়াও আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক কবিতার গতি, তার ছন্দ-স্পন্দ, সেখানে শ্রবণেন্দ্রিয়ের ভূমিকা, অন্য ভাষার অনুবাদে পুরোপুরি আসার কথা নয়। পরোক্ষ অনুবাদে সেটা একেবারেই হারিয়ে যেতে পারে। বাংলা ভাষায় যতো বিদেশি কবিতার অনুবাদ এযাবৎকাল হয়েছে, তার অধিকাংশই পরোক্ষ। ‘সুকবির হাতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে, অনুবাদও প্রায় পুনঃসৃষ্টির স্তরে পৌঁছতে পারে, তবে তার সম্ভাবনা কম’ লিখেছেন জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী। তিনি আরো মনে করেন-‘কবিতার অনুবাদ যে সবচেয়ে জটিল, এ বিষয়ে দ্বিমত নেই। কোনো কবিতার কোনো অনুবাদ কোনোদিন সকলের মনঃপুত হয় নি। তবু কবিতার অনুবাদ, অনুবাদের ইতিহাসে একটা বড়ো জায়গা জুড়ে আছে। অনুবাদ দুঃসাধ্য বলেই অনুবাদক নিরস্ত হন নি। অনুবাদ আধুনিক কবিদের কাছে আত্মআবিষ্কার ও বিশ্ব-অম্বেষা।’ যেমন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজীর মনে হয়েছে, ‘অনুবাদ বিষয়বস্তু থেকে শুরু করে ভাষার চরিত্র নির্মাণে তাঁকে সহযোগিতা’ করে। ভাষার চরিত্র নির্মাণে অনুবাদ যে সহযোগিতা করে তা প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের অনুবাদ শাখা প্রমাণ রেখে গেছে। রাদুগা প্রকাশনীর সেসব অনূদিত গ্রন্থ এখনো ভাষার উৎকর্ষ সাধন করে চলেছে। অনুবাদ কেবল আক্ষরিক কিংবা ভাবানুবাদ নয় পুনঃসৃজনে নতুন রূপ নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে রুশ সাহিত্যকর্ম। রবীন্দ্রনাথের সূত্রে বাংলা ভাষা শিখে সাহিত্যের অনুবাদে সাফল্যের পরিচয় দিয়েছেন একাধিক গবেষক ও পণ্ডিত। বাংলা থেকে জার্মান অনুবাদে এগিয়ে আছেন অধ্যাপক ড. হান্স সাডার, মার্টিন ক্যামশন, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, হেলেন মেয়ার ফ্যাঙ্ক-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তবে জার্মান ভাষায় রবীন্দ্রনাথের ‘গীতাঞ্জলি’ অনূদিত হয়ে প্রকাশিত হয় ১৯১৪ সালে। একাধিক ভাষা জানলেও কবি বুদ্ধদেব বসু জার্মান জানতেন কিনা আমার জানা নেই। তবু তিনি হ্যেল্ডার্লিন (১৯৬৭) এবং রাইনের মারিয়া রিলকের(১৯৭০) কবিতা অনুবাদ করে জার্মান কবিতাকে জনপ্রিয় করে তোলেন। অনুবাদে তিনি প্রাঞ্জলতার প্রকাশ ঘটিয়ে এক নতুন আঙ্গিকের কবিতার আস্বাদ তৈরি করেছেন। মূলত তিনি কবিতার অনুবাদের ক্ষেত্রে ‘আত্মসাৎ’ করেছেন সেই ভাবকে। ভিন্ন ভাষার কবিতাটির উপর পূর্ণ আধিপত্য বিস্তার করার পর কবিতাটিকে তিনি নিজের মতো নিজের উপলব্ধিতে, ও পরে তার ভাষিক অভিব্যক্তিতে রূপান্তরিত করেছেন। ফলে এটি একটি নবসৃষ্টি, কেবল প্রথাগত অনুবাদ নয়। ইংরেজি থেকে জার্মান ভাষার কবিতার অনুবাদের ক্ষেত্রে বিশেষ একটি কোনো অনুবাদের উপর তাঁর নির্ভরতা ছিল না। বহু পরিশ্রমে তিনি কবিতার মর্মস্থলে প্রবেশ করতেন। বুদ্ধদেব বসু ছিলেন কবিতার প্রতি স্বতঃস্ফূর্ত সমর্পিত, পরিশ্রমী পাঠক ও সতর্ক-সচেতন পুনর্সৃষ্টির স্রষ্টা। জার্মান কবিতাগুলো যেন বাংলা ভাষার কবিতা হিসেবে পাঠ্যযোগ্য হয় সেই চেষ্টা করেছেন বুদ্ধদেব। কেননা তাঁর বিশ্বাস যে কবিতার অনুবাদের পক্ষে কবিতা হয়ে ওঠাই সব

ভাষার প্রসার এবং অনুবাদ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘‘অনুবাদচর্চ্চা’’ নামে একটি বই আছে সেখানে শিক্ষার্থীদের অনুবাদ শিক্ষা দেওয়ার জন্য শিক্ষকদের প্রতি ভূমিকাংশে বেশ কিছু নির্দেশনা বর্ণিত হয়েছে। তিনি মনে করতেন, ইংরেজি থেকে বাংলা অনুবাদ অত্যন্ত দুঃসাধ্য। তবে তিনি বিশ্বাস করতেন, ‘যদি যথোচিত অধ্যবসায়ের সঙ্গে অন্তত দুই বৎসর কাল এই অনুবাদ প্রত্যনুবাদের পন্থা ধরে ভাষাব্যবহারের অভ্যাস ঘটানো যায় তা হলে ইংরেজি ও বাংলা দুই ভাষাতেই দখল জন্মানো সহজ হবে। বিদেশী ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে অনুবাদ যে উৎকৃষ্ট পন্থা তা তিনি স্পষ্ট করেছিলেন এভাবে-‘দুই সম্পূর্ণ বিভিন্ন ভাষার মধ্যে কথায় কথায় অনুবাদ চলতেই পারে না। ইংরেজি ও বাংলা দুই ভাষায় প্রকাশের প্রথা স্বতন্ত্র এবং পরস্পরের মধ্যে শব্দ ও প্রতিশব্দের অবিকল মিল পাওয়া অসম্ভব, এই কথাটি তর্জ্জমা করতে গিয়ে যতই আমাদের কাছে ধরা পড়ে ততই উভয় ভাষার প্রকৃতি স্পষ্ট করে বুঝতে পারি। এই জন্যে অনুবাদের যোগে বিদেশী ভাষাশিক্ষার প্রণালীকে আমি প্রশস্ত বলে মনে করি।’

ভাষা শিক্ষার প্রণালি হিসেবে অনুবাদের গুরুত্ব আমাদের দেশে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের দীর্ঘ সাত দশক পরও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তবে ২০২০ সালের বইমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘অমর একুশে বইমেলার মধ্য দিয়ে আমাদের শিল্প-সংস্কৃতিকে কেবল বাংলাদেশের মধ্যেই নয়, বিশ্ব দরবারে পৌঁছাতে চাই।’ এর আগেও তিনি অনুবাদের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন একাধিক অনুষ্ঠানের বক্তব্যে। ফলে সম্প্রতি বাংলা একাডেমি ‘অনুবাদ’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছে এবং অনূদিত পাঠ্যপুস্তক প্রকাশে সক্রিয় হয়েছে। অন্যদিকে ১৮ ফেব্রæয়ারি(২০২১) বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ‘আমার ভাষা’ নামে একটি অনুবাদ সফটওয়্যার উদ্বোধন করেছে। এই সফটওয়্যার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে সুপ্রিম কোর্টের আদেশ ও রায়গুলি ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করতে সক্ষম। অর্থাৎ অনুবাদের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষা প্রসারিত হওয়া শুরু হয়েছে ক্রমান্বয়ে।

অবশ্য বাংলা সাহিত্যের আধুনিক কবি-সাহিত্যিকরা অনুবাদের অনলস ভোক্তা, উপরন্তু নিজেরাও অনুবাদক। অনুবাদও একটি সপ্রাণ, সংক্রামক, মূল্যবান সাহিত্যকর্ম, এবং কখনো-কখনো তা সৃষ্টিকর্মেরও মর্যাদা পায়। অনুবাদ সম্পর্কে কবি-কথাসাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ‘অন্যদেশের কবিতা’ গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেছেন- ‘মূল ভাষা না জেনে অনুবাদ করার প্রচেষ্টা গুরুতর ধৃষ্টতা বা অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। কিন্তু এ জন্য আমি নিজেকে তেমন অপরাধী মনে করি না, তার প্রথম ছোট কারণ শব্দের সৌকুমার্য যখন ভাষান্তরিত করা অসম্ভব, তখন মূল ভাষা জানার প্রশ্ন তেমন জরুরি নয়, দ্বিতীয়ত, আমার আগে এই ধরনের অনুবাদের কাজ বাংলাদেশে করেছেন আরও অন্ততঃ পঞ্চাশ জন কবি, যাদের শিরোভাগে আছেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ।’

বাংলা কবিতায় অনুবাদ চর্চা বেগবান হয়েছে এই অনিবার্য দূরত্বকে স্বীকার করে নিয়ে। এই দূরত্ব দূর করতে পারা গেলে অনুবাদেও এক গুণগত পরিবর্তন আসবে, এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। মূল কবিতার শব্দে অর্থের যে ব্যঞ্জনা, অনুবাদক তাতে নানা ভাবে সাড়া দিয়ে থাকেন, কারণ অনেক শব্দই একার্থক নয়। বিশেষ অনুবাদে তার একটি অর্থই ধরা পড়ে, ব্যঞ্জনার বাকিটুকু মূল ভাষার সঙ্গে পরিচয় না হলে চিরদিন অজানা থেকে যায়। শব্দার্থগত দিক ছাড়াও আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক কবিতার গতি, তার ছন্দ-স্পন্দ, সেখানে শ্রবণেন্দ্রিয়ের ভূমিকা, অন্য ভাষার অনুবাদে পুরোপুরি আসার কথা নয়। পরোক্ষ অনুবাদে সেটা একেবারেই হারিয়ে যেতে পারে। বাংলা ভাষায় যতো বিদেশি কবিতার অনুবাদ এযাবৎকাল হয়েছে, তার অধিকাংশই পরোক্ষ।

‘সুকবির হাতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে, অনুবাদও প্রায় পুনঃসৃষ্টির স্তরে পৌঁছতে পারে, তবে তার সম্ভাবনা কম’ লিখেছেন জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী। তিনি আরো মনে করেন-‘কবিতার অনুবাদ যে সবচেয়ে জটিল, এ বিষয়ে দ্বিমত নেই। কোনো কবিতার কোনো অনুবাদ কোনোদিন সকলের মনঃপুত হয় নি। তবু কবিতার অনুবাদ, অনুবাদের ইতিহাসে একটা বড়ো জায়গা জুড়ে আছে। অনুবাদ দুঃসাধ্য বলেই অনুবাদক নিরস্ত হন নি। অনুবাদ আধুনিক কবিদের কাছে আত্মআবিষ্কার ও বিশ্ব-অম্বেষা।’ যেমন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজীর মনে হয়েছে, ‘অনুবাদ বিষয়বস্তু থেকে শুরু করে ভাষার চরিত্র নির্মাণে তাঁকে সহযোগিতা’ করে। ভাষার চরিত্র নির্মাণে অনুবাদ যে সহযোগিতা করে তা প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের অনুবাদ শাখা প্রমাণ রেখে গেছে। রাদুগা প্রকাশনীর সেসব অনূদিত গ্রন্থ এখনো ভাষার উৎকর্ষ সাধন করে চলেছে। অনুবাদ কেবল আক্ষরিক কিংবা ভাবানুবাদ নয় পুনঃসৃজনে নতুন রূপ নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে রুশ সাহিত্যকর্ম।

রবীন্দ্রনাথের সূত্রে বাংলা ভাষা শিখে সাহিত্যের অনুবাদে সাফল্যের পরিচয় দিয়েছেন একাধিক গবেষক ও পণ্ডিত। বাংলা থেকে জার্মান অনুবাদে এগিয়ে আছেন অধ্যাপক ড. হান্স সাডার, মার্টিন ক্যামশন, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, হেলেন মেয়ার ফ্যাঙ্ক-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তবে জার্মান ভাষায় রবীন্দ্রনাথের ‘গীতাঞ্জলি’ অনূদিত হয়ে প্রকাশিত হয় ১৯১৪ সালে। একাধিক ভাষা জানলেও কবি বুদ্ধদেব বসু জার্মান জানতেন কিনা আমার জানা নেই। তবু তিনি হ্যেল্ডার্লিন (১৯৬৭) এবং রাইনের মারিয়া রিলকের(১৯৭০) কবিতা অনুবাদ করে জার্মান কবিতাকে জনপ্রিয় করে তোলেন। অনুবাদে তিনি প্রাঞ্জলতার প্রকাশ ঘটিয়ে এক নতুন আঙ্গিকের কবিতার আস্বাদ তৈরি করেছেন। মূলত তিনি কবিতার অনুবাদের ক্ষেত্রে ‘আত্মসাৎ’ করেছেন সেই ভাবকে। ভিন্ন ভাষার কবিতাটির উপর পূর্ণ আধিপত্য বিস্তার করার পর কবিতাটিকে তিনি নিজের মতো নিজের উপলব্ধিতে, ও পরে তার ভাষিক অভিব্যক্তিতে রূপান্তরিত করেছেন। ফলে এটি একটি নবসৃষ্টি, কেবল প্রথাগত অনুবাদ নয়। ইংরেজি থেকে জার্মান ভাষার কবিতার অনুবাদের ক্ষেত্রে বিশেষ একটি কোনো অনুবাদের উপর তাঁর নির্ভরতা ছিল না। বহু পরিশ্রমে তিনি কবিতার মর্মস্থলে প্রবেশ করতেন। বুদ্ধদেব বসু ছিলেন কবিতার প্রতি স্বতঃস্ফূর্ত সমর্পিত, পরিশ্রমী পাঠক ও সতর্ক-সচেতন পুনর্সৃষ্টির স্রষ্টা। জার্মান কবিতাগুলো যেন বাংলা ভাষার কবিতা হিসেবে পাঠ্যযোগ্য হয় সেই চেষ্টা করেছেন বুদ্ধদেব। কেননা তাঁর বিশ্বাস যে কবিতার অনুবাদের পক্ষে কবিতা হয়ে ওঠাই সবচেয়ে জরুরি দরকার। একথা সত্য, বুদ্ধদেব বসু কালিদাসের মেঘদূত কাব্য মূল সংস্কৃত থেকেই তর্জমা করেছিলেন কিন্তু হ্যেল্ডার্লিনের বা রিলকের জার্মান পাঠ তাঁর পুরোপুরি আয়ত্তে ছিলো না। অবশ্য সুধীন্দ্রনাথ দত্তের অনুবাদে কবি হাইনে যেন পুরোপুরি ভারতীয় ঐতিহ্যের অন্তর্গত হ’য়ে গেছেন।

২০১২ সালে প্রকাশিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ একাধিক ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ইংরেজি, চীনা, জাপানি, উর্দু, স্প্যানিশ, ফরাসি প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। অন্যদিকে ২০১৯ সালে বাংলা একাডেমি থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে মিশরের সাংবাদিক ও লেখক মোহসেন আল আরিশি’র আরবী ভাষায় লিখিত বই-এর বাংলা অনুবাদ ‘শেখ হাসিনা : যে রূপকথা শুধু রূপকথা নয়’ প্রকাশিত হয়েছে। মনে রাখতে হবে, বাংলা একাডেমির অনুবাদ বিভাগ স্বাধীনতার আগে থেকে বিভিন্ন ভাষার সাহিত্যের বাংলা অনুবাদ পাঠকদের হাতে তুলে দেয়। তবে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উন্নয়নের জন্য বিশ্বের অন্যান্য উন্নত ভাষায় রচিত সাহিত্য ও চিন্তামূলক রচনার অনুবাদ অনস্বীকার্য মনে করে বিশ্বসাহিত্যের বাংলা অনুবাদ ব্যাপকভাবে শুরু হয় স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সাল থেকে। অনুবাদকেও সাহিত্য হয়ে উঠতে হয়, শুধু মূল বক্তব্যকে প্রকাশ করলেই অনুবাদ হয় না। কবি-সাহিত্যিকের বক্তব্য ও ভাবকে অনুবাদের মাধ্যমে সত্যিকার রসসিক্ত সাহিত্য করে তুলতে হয়। অনুবাদকের কৃতিত্ব এখানেই। এই কৃতিত্ব দেখিয়েছেন বাংলা একাডেমির অনুবাদকরা।

বাংলা একাডেমির বাইরে আরো কিছু অনুবাদে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে। বাংলা সাহিত্য অনুবাদের মধ্য দিয়ে প্রসারিত এবং বিস্তৃত হচ্ছে। কবি-ঔপন্যাসিক মাসরুর আরেফিন অনুবাদে কষ্টসাধ্য পরিশ্রম করে যাচ্ছেন এখনো। তিনি আক্ষরিক অনুবাদের চেয়ে ভাবানুবাদে বেশি মনোযোগী। তবে মূলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে সতর্ক। কাফ্ফা কিংবা ইলিয়ড অনুবাদে তিনি বাংলা ভাষার ওপর তাঁর দখলের সবটুকু ঢেলে দিয়েছেন। তাঁর মতে অনুবাদ মানুষকে মানুষের কাছে আনে। একজনকে অপরের সংস্কৃতি বুঝতে সহায়তা করে। ভিনভাষার সাহিত্যের অনুবাদ ওই দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ককে দৃঢ় বন্ধনে আবদ্ধ করবে। আর বিশ্ব সাহিত্যের অনুবাদের মধ্য দিয়ে বৈশ্বিক সংস্কৃতির উন্মুক্ত অঙ্গনে সকলের মিলন ঘটবে। বিশ্বভাষা ইংরেজির মধ্যস্থতাতেই অনুবাদ চর্চা করতে হচ্ছে তাঁকে। তবে এক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হয় যেন মূল ইংরেজি অনুবাদটা প্রতিষ্ঠিত ও নির্ভরযোগ্য কারও হাতে যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়ে থাকে। অনুবাদের মধ্য দিয়ে অন্য একটি ভাষায় সাহিত্যকে যথাযথ লাবণ্য ও ব্যঞ্জনাসহ তুলে আনা এক বড় চ্যালেঞ্জ। তা-ও আবার অন্য এক ভাষায় অনূদিত রূপ থেকে।

জার্মান মহাকবি গ্যেটে ১৮২৮ সালে লিখেছিলেন, ‘অনুবাদক হলেন তার নিজের জাতির দেবদূত।’ তাঁর মতে, প্রত্যেক সাহিত্যই শেষ পর্যন্ত নিজেকে নিয়ে ক্লান্ত বিরক্ত হয়ে ওঠে, যদি কোনো বিদেশী উৎস থেকে সে আবার তরতাজা না হতে পারে। বিদেশী সাহিত্যের সঙ্গে সংযোগের ফলে গ্যেটের নিজের সাহিত্য এবং ইউরোপের সকল সাহিত্য কিভাবে বার বার সঞ্জীবিত হয়েছে, কিভাবে নতুন প্রাণের ধাক্কায় তার ক্লান্তি, তার গতানুগতিকতা কাটিয়ে উঠেছে, তিনি এ বিষয়ে অবহিত ছিলেন। তাঁর সারা জীবনের সাহিত্য-কর্মে যে নিত্য-নতুনতা তাও তাঁর বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন সাহিত্যের সঙ্গে যোগাযোগের ফল। গ্যেটে যেমন ইরানের কবি হাফিজের কবিতার (ইংরেজি থেকে) জার্মান অনুবাদ পড়ে পারস্য সংস্কৃতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হন এবং রচনা করেন ‘দিওয়ান অব দ্যা ওয়েস্ট অ্যান্ড ইস্ট’ তেমনি গ্যেটের রচনা ইংরেজিতে পড়ে বাঙালি কবি-সাহিত্যিকরা তাঁর কল্পনার ব্যাপ্তি ও সৃষ্টির রহস্য অনুভব করে উদ্বেলিত হন উনিশ শতকেই। বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশকে অনুবাদকরা গ্যেটের সৃষ্টি কর্মের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদে আত্মনিয়োগ করেন। পরবর্তী সময় জার্মান সাহিত্যের প্রভাব আরো বৃদ্ধি পায়।

অবশ্য বিশ্ব সাহিত্য বিষয়ে কৌতূহল মেটানোর জন্য এখনও এদেশে প্রধান উপায় হলো ইংরেজি অনুবাদের শরণাপন্ন হওয়া। ইংরেজি ভাষার বাইরে যে সব বই প্রধানত কবিতা এখানে অনুবাদ হয়েছে, তার প্রায় সবটাই ইংরেজি অনুবাদের মধ্যস্থতায়। বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অনুবাদে কোনো গ্রহণযোগ্য মান অর্জিত হয়নি। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কোনো স্পষ্ট ও দৃঢ় ভাষানীতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে কোনো অনুবাদ নীতি গৃহীত না হওয়ায় ভাষা শিক্ষা ও অনুবাদ চর্চা দুর্বলতা দোষে চিহ্নিত। তবে বাংলায় বিশ্বসাহিত্যের অনুবাদে টেক্সচুয়াল লেভেলের আক্ষরিক অনুবাদ এবং একইসঙ্গে রেফারেনসিয়াল বা অনুষঙ্গ অথবা পরোক্ষ ইশারা আবিষ্কার করে অনুবাদকরা পরিশ্রমের স্বাক্ষর রেখেছেন। ফলে মূলের সঙ্গে কোনো অনুবাদই অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে ওঠেনি। আক্ষরিক ও কাঠামোগত অভিন্নতাকে বজায় রেখে কোহেসিভ লেভেলও অর্থ ও ব্যঞ্জনায় স্নাত হয়েছে। অনুবাদ হয়ে উঠেছে পুনর্সৃষ্টি। ফলে বাংলা ভাষার ঘটেছে ব্যাপক প্রসার।

লেখক : ইউজিসি পোস্ট ডক ফেলো এবং বিশিষ্ট লেখক, কবি, কলামিস্ট, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রগতিশীল কলামিস্ট ফোরাম, নির্বাহী কমিটির সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ এবং অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

drmiltonbiswas1971@gmail.com

এইচআর/এমএস