বাল্যবিয়ের খবর পেলেই ছুটে যান দামুড়হুদার ইউএনও

হতে চেয়েছিলাম ডাক্তার; কিন্তু ভাগ্যক্রমে চলে এসেছি প্রশাসনে।তবে এতে কোনো আফসোস নেই। একজন নারী হিসেবে উপজেলা প্রশাসনের তাবৎ তদারকিতে আমার কোনো সমস্যা হয় না। যেহেতু আমাদের প্রশাসনিক কাজ ২৪ ঘণ্টার। তাই কখনো কখনো পরিবারে সময় দিতে পারি না।

 

বিশেষ করে আমার দুই শিশুসন্তান আমাকে খুব মিস করে। তাদেরকে যেভাবে সময় দেওয়ার কথা সেভাবে দিতে পারি না।’কথাগুলো বলছিলেন চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা নবাগত উপজেলা নির্বাহী অফিসার তাছলিমা আক্তার। তিনি চতুর্থ নারী ইউএনও হিসেবে এ বছরের ১২ সেপ্টেম্বর দামুড়হুদায় যোগদান করেছেন। তবে বর্তমানে তিনি জেলার একমাত্র নারী ইউএনও। এখানে যোগদানের পর থেকেই তাছলিমা আক্তার সরব বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে।

 

যেখানেই বাল্যবিয়ে সেখানেই ছুটছেন তিনি। এছাড়া নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ ও নারী কর্মীদের সুরক্ষায়ও বিশেষভাবে কাজ করে চলেছেন ইউএনও তাছলিমা আক্তার। তিনি বলেছেন ‘আমাদের শিক্ষাকে এগিয়ে নিতে পিতা-মাতাকে বেশি সচেতন হতে হবে। ছেলে-মেয়ের প্রতি বিশেষভাবে নজর রাখতে হবে। তারা কোথায় থাকছে, কী করছে সেদিকে খেয়াল রাখা খুবই প্রয়োজন।কলেজে প্রবেশের আগে স্কুলজীবনে কোনো শিক্ষার্থী যাতে মোবাইলফোন ও ইন্টারনেটের ব্যবহার না করে সেদিকেও নজর রাখতে হবে অভিভাবকদের। এসব বিষয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে আমি প্রায়ই বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করে থাকি।’

 

ভোলা জেলার বোরহান উদ্দীন উপজেলার দেউলা ইউনিয়নের চটিয়া গ্রামের ইউনুছ আলী খান ও সুফিয়া বেগমের মেয়ে তাছলিমা আক্তার ছেলেবেলা থেকেই ঢাকার বাসিন্দা ছিলেন। পিতা ইউনুছ আলী খান এআর ফোর্সে চাকরি করতেন। সেই সুবাদে ঢাকার বিএএফ শাহীন কলেজে শিশু শ্রেণিতে ভর্তি হন। সেখান থেকেই প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও কলেজ জীবনের সমাপ্তি ঘটান তাছলিমা আক্তার। এরপর ২০০৪-২০০৫ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে ভর্তি হন। পরে ৩১তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে নিয়োগ পান তিনি। প্রখর মেধার অধিকারী তাছলিমা আক্তার ২০১৩ সালের ১৫ জানুয়ারি ঝিনাইদহে সহকারী কমিশনার হিসেবে চাকরিতে যোগদান করেন।

 

দুই কন্যাশিশুর জননী ইউএনও তাছলিমা আক্তার। বড় মেয়ে মেহেরিশ প্রিয়না শরিফ ও ছোট মেয়ে মেহরোজ আতিফা শরিফকে ঘিরে তার অনেক স্বপ্ন। একই রকম স্বপ্ন দেখাতে চান অন্যান্য পিতা-মাতাকেও। তিনি বলেন ‘কন্যাসন্তানকে যেন আমরা কেউ অবহেলা না করি। মূল কথা হলো ছেলে-মেয়ে যাই হোক না কেন তাদেরকে মানুষের মতো মানুষ করতে পারলেই একজন পিতা-মাতা সার্থক হন। নারী-পুরুষের মধ্যে কোনো বৈষম্য না রেখে লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। তাতে অবশ্যই সফলতা আসবে।’দামুড়হুদা উপজেলা নির্বাহী অফিসার তাছলিমা আক্তার বলেন, ‘ছেলেবেলা থেকে স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হব। সেই লক্ষ্যে লেখাপড়া করেছি। ভেবেছিলাম বিদেশে গিয়ে আরও ডিগ্রি অর্জন করব। কিন্তু সেই ইচ্ছে পূরণ হয়নি সত্যি। তবে একটা জায়গা তো পেয়েছি। প্রশাসন ক্যাডারে নিয়োগ পেয়ে বাবা-মাকে স্বস্তি দিতে পেরেছি। তাই আমি চাই আমার দেশের ছেলে-মেয়েরা বড় স্বপ্ন দেখুক। একদিন না একদিন সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেবে।’

 

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় দামুড়হুদা উপজেলা নির্বাহী অফিসার তাছলিমা আক্তারের সঙ্গে তার অফিস কক্ষে এই আলাপচারিতা হয়। একজন নারী হিসেবে উপজেলা প্রশাসনকে সামলাতে কোনো সমস্যার সম্মুখীন হন কি না? এমন প্রশ্নের জবাবে তাছলিমা আক্তার বলেন, ‘না। তেমন কোনো সমস্যা হয় না। সবার সহযোগিতা পাই। রাত-দিন সমানে কাজ করি।’ চুয়াডাঙ্গা জেলা বাল্যবিয়ে প্রবণ জেলা। দামুড়হুদাতেও অহরহ বাল্যবিয়ে হয়।

 

এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা বাল্যবিয়ের কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিরোধে ছুটে যাই। অভিভাবকদের বুঝিয়ে বাল্যবিয়ে থেকে অনেক অপ্রাপ্ত বয়সি ছেলে-মেয়েকে রক্ষা করি। অনেক ক্ষেত্রে গোপনে বাল্যবিয়ে হয়ে যায়। অনেক খবরই আমরা পাইনা। তবে আমি আন্তরিকভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি বাল্যবিয়ে ও ইভটিজিং প্রতিরোধে। আশা করি আমি সফল হব।’