গাংনীর ধলা গ্রাম এখন শ্মশানের নিরবতা

জোড়া খুনের ঘটনায় মামলা \ আসামী ৬৬

মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার কাথুলী ইউনিয়নের ধালা গ্রামের জোড়া খুনের ঘটনায় হত্যা মামলা হয়েছে। নিহত সহোদ্বরের ভাই বেল্টু বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। এদিকে গ্রাম ছেড়েছে সহিংসতার ঘটনায় জড়িতরা ছাড়াও সাধারণ মানুষ। গ্রেফতার ও পুলিশি হয়রানী এড়াতে গ্রাম ছেড়েছে বলে জানিয়েছেন তারা। তবে পুলিশ বলছে অহেতুক কেউ হয়রানীর শিকার হবেনা। তাছাড়া দোষীদেরকে অনতি বিলম্বে গ্রেপ্তার করা হবে।

 

সরেজমিনে গাংনীর ধলা গ্রামে দেখা যায়, শ্মশানের নিরবতায় নিমজ্জিত পুরো গ্রাম। চায়ের দোকান ও রাস্তাঘাটে নেই জনমানব। নিহতের পরিবার থেকে ভেসে আসছে কান্নার রোল আর স্বজনদের আহাজারি। একই পরিবারে দুইজনকে হারিয়ে নিহতের পরিবারের অনেকেই মুর্ছা যাচ্ছেন বারবার। কয়েক জায়গায় দেখা মেলে বাড়ির সামনে বসে আছেন বৃদ্ধ মহিলা ও শিশুরা। তাদের চোখেও জল। মুখে আতংকের ছাপ সবার। দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছেন বৃদ্ধরা। তাদের চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে জল। অনেকের সাথেই কথা বলার জন্য এগিয়ে গেলেও মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন গ্রামে থাকা মহিলারা। স্বজন হারানোর ব্যথা বুকে চেপে প্রহর গুণছেন দোষিদের গ্রেপ্তার ও শাস্তির।

 

সোমবার (৮ নভেম্বর) সকাল ৯টার সময় নির্বাচনে অংশ গ্রহনকারি দুই মেম্বার প্রার্থী আজমাইন হোসেন টুটুল (বর্তমান মেম্বার) ও উপজেলা কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক আতিয়ার রহমান সমর্থকদের মধ্যে তুমুল সংঘর্ষে টুটুলের চাচাত দুই ভাই সাহাদুল ইসলাম ও জাহারুল ইসলামকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে আতিয়ার রহমানের লোকজন। এঘটনায় মেম্বার প্রার্থী টুটুল ও নারীসহ আন্তত ২০ জন আহত হন। আহতদের অবস্থা দেখে কুষ্টিয়া ও রাজশাহী মেডিকেলে ভর্তি করা হয়। নিহতের পরিবারেও এখন পুরুষ শুন্য। তবে পুলিশ,র‌্যাব,ডিবি পুলিশ মোতায়েন রয়েছে গ্রামে।

 

গতকালই তাৎক্ষনিক ভাবে ১২ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে গাংনী থানায় নেয়া হয়। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত আটক ব্যাক্তিদের থানা হেফাজতেই রাখা হয়েছে বলে থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিশ্চিত করেন।
আজমাইন হোসেনে টুটুলের বোন সুচিন্তারা বলেন,আতিয়ার রহমানের লোকজনের আতর্কিত হামলায় ২০১০ সালে টুটুলের ভাই সেন্টুকে কুপিয়ে হত্যা করে। সেন্টু হত্যা মামলাটি আপোষ মিমাংসার মাধ্যমে নিস্পত্তি হয়। সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ২০১৭ সালে মেজ ভাই এনামুল হক নইলু কে নবীনপুর রাস্তায় একা পেয়ে আতিয়ার রহমান ও তার লোকজন কুপিয়ে খুন করে। সেই হত্যা মামলায় আতিয়ার রহমানকে প্রধান আসামী করে বিজ্ঞ আদালতে একটি হত্যা মামলা করা হয়। মামলাটির স্বাক্ষি সম্পন্ন হয়েছে। বিগত ইউপি নির্বাচনে মেম্বার পদে অংশ গ্রহন করে আমার ভাই টুটুলের সাথে ব্যাপক ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়। এবারও তারা দুজনই প্রতিদ্বন্দীতা করছে।

 

ভোট চাওয়াকে কেন্দ্র করে গতকাল সকালে আতিয়ার রহমান ও তার লোকজন টুটুলের লোকজনের ওপর আতর্কিত হামলা করে। এ হামলায় আমার আপন চাচাত দুইভাই সাহাদুল ও জাহারুল নিহত হয়। আতিয়ার বাহিনীর হাতে একই পরিবার বা বংশের ৪জন খুনের ঘটনায় পুরো পরিবারই ধ্বংশের মুখে। তবে এপর্যন্ত মামলা হয়নি বলেও জানান তিনি।

নিহত জাহারুলের বোন রেক্সনো খাতুন বলেন, জাহারুলের এক ছেলে এক মেয়ে। ছেলে শাকিল আহমেদ বিদেশ থাকে। মেয়ে চম্পা অনার্স পড়ছে। সাহাদুলের এক ছেলে এক মেয়ে জাহিদুল ও সুবর্ণা। জাহিদুল বিদেশ থাকে এবং সুবর্ণা স্বামীর সংসারে। পরিবারের সকলেই আহত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকায় এখনো মামলা করা হয়নি। এছাড়া আমাদের এখন রাস্তায় বের হতে পারছিনা। কারন আতিয়ারের লোকজন এলাকাতেই আতœগোপনে আছে। যে কোনো সময় আবারও আমাদের ওপর হামলা চালাতে পারে এমনকি বাড়িঘর লুট করতে পারে।

 

তিনি আরো বলেন, একে একে আমার চারটি ভাই আতিয়ারের হাতে খুন হলো। সে জামিনে এসে নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। আবারও আমার দুই ভাইকে খুন করল। আমরা তার ফাঁসি চাই। বর্তমান ডিজিটাল সময়ে দ্রæত সময়ের মধ্যে আতিয়ার ও তার লোকজনকে গ্রেপ্তার করা না হলে আমাদের ওপর আবারো হামলা চালাতে পারে। প্রতিবেশী কয়েকজন জানান, নিহতের নিহতের পরিবারের আহাজারিতে এলাকার আকাশ ভরি হয়ে উঠেছে। যে দিকে তাকায় শুধু শোক আর শোক।
গাংনী থানার (ওসি) তদন্ত শাহ আলম জানান, নিহত দুই জন সাহাদুল ও জাহারুলের মরদেহ ময়না তদন্ত সম্পন্ন শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং পারিবারিক ভাবে তাদের দাফন সম্পন্ন হয়েছে ।

 

আফিসার ইনচার্জ বজলুর রহমান জানান, ইতোমধ্যে ১২ জনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। কেউ জড়িত থাকলে তাকে ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হবে।

 

মেহেরপুর পুলিশ সুপার রাফিউল আলম জানান, গাংনীর ল²ীরানায়নপুর ধলা গ্রামের দুই খুনের ঘটনায় নতুন করে আর কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। সেখানে পুলিশি পাহারা জোরদার করা হয়েছে। তবে ঘটনার সাথে সাথেই আতংকে পুরুষ শুন্য হয়ে পড়ে এলাকা। সাধারণ মানুষ হয়রানী না হয় সে বিষয়ে পুলিশ সজাগ রয়েছে।