চলে গেলেন দামুড়হুদার সফল জননী মেজর মানিকের মা জাহানারা হোসেন

জীবনযুদ্ধে হার না মানা একজন সফল জননীর সংগ্রামী জীবনের গল্পটা বেশ লম্বা। দামুড়হুদার সভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের বড় মেয়ে জাহানারা হোসেনের বেশ ঘটা করেই বিয়ে হয় একই উপজেলার লোকনাথপুর গ্রামের কৃতিসন্তান খাদেশ হোসেনের সাথে। স্বামী খাদেম হোসেন ছিলেন রংপুরের শ্যামপুর সুগারমিলের ক্যামিস্ট। স্বামী আর ৩ মেয়ে আর ১ ছেলে সন্তান নিয়ে তাদের সুখের সংসার।

 

অনেকটা হঠাৎই সুখের সংসারে নেমে আসে অন্ধকারের কালোছায়া। ১৯৮৯ সালে স্বামী খাদেম হোসেন আকর্স্মিক মৃত্যুবরণ করেন। স্বামীর আকর্স্মিক মৃত্যুতে আকাশ ভেঙ্গে পড়ে তার মাথায়। অনেকটা বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো। একরাশ হতাশা ঘিরে ধরে তাকে। নাবালক ৪ সন্তানকে কিভাবে মানুষের মতো মানুষ করবেন এই ভেবেই সাময়িক ভেঙ্গে পড়েন তিনি।

 

তাদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে শোককে শক্তিতে পরিনত করে শক্ত হাতে সংসারের হাল ধরেন ওই মহিয়শী নারী জাহানারা হোসেন। শুরু হয় সংগ্রামী জীবন। অনেক চড়াই উৎরায় পেরিয়ে ৩ মেয়েকেই উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করেন। বড় মেয়ে খুরশিদা জাহান। সে ব্যক্তিগত জীবনে একজন গৃহিনী। মেজো মেয়ে খালেদা জাহান স্বামী সন্তান নিয়ে স্ব-পরিবারের ফ্রান্সে বসবাস করেন। ছেটো মেয়ে খাদিজা জাহান নাসরিন সরকারি প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষক। একমাত্র ছেলে জুলফিক্কার রিয়াদ পারভেজ মানিক।

 

মানিক ঝিনাইদহ ক্যাডেট থেকে লেখাপড়া শেষে বাংলাদেশ সেনাবহিনীতে যোগদান করেন। সে শিক্ষা জীবনে কখনও দ্বিতীয় হয়নি। কর্মজীবনেও প্রতিটি পরিক্ষায় ফাস্ট হয়েছেন। মানিক বর্তমানে মেজর পদে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে কর্মরত।

 

বলছিলাম দামুড়হুদা বেগোপাড়ার মরহুম শাহার আলীর বড় মেয়ে মেজর মানিকের মা জাহানারা হোসেনের কথা। তিনি আর আমাদের মাঝে নেই। গত বুধবার বাংলাদেশ সময় সকাল ১০ টার দিকে ভারতের নিউ দিল্লিস্থ ম্যাকস্ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন তিনি। মাস দুয়েক আগে তিনি অস্বুস্থ্য হয়ে পড়েন। পরিবারের লোকজন তাকে জরুরীভাবে ঢাকা নেয় এবং সিএমএইচ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ওখানে তার দেহের ডানদিকের কিডনীর পাশে টিউমার ধরা পড়ে। উন্নত চিকিৎসার জন্য গত ৬ জানুয়ারী তাকে নেয়া হয় ভারতের দিল্লিস্থ গঙ্গারাম হাসপাতালে। ওখানে কয়েকদিন চিকিৎসার পর নিউ দিল্লির ম্যাকস্ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ওই হাসপাতালেই গত মঙ্গলবার তার টিউমার অপারেশনসহ ওপেন হার্ট সার্জারি করা হয়। দির্ঘ ১২ ঘন্টা ধরে অপারশেনের পর তিনি কোমায় চলে যান এবং গত বুধবার সকাল ১০ টার দিকে শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন।

 

৩ ফেব্রæয়ারী বৃহস্পতিবার বিকেল ৪ টার ফ্লাইটে ভারতের নিউ দিল্লি থেকে বিমানযোগে তাকে প্রথমে ঢাকায় নেয়া হয়। রাত ৮ টার দিকে লাশ নেয়া হয় ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট মসজিদের সামনে। ওখানে সেনাবাহিনীর অফিসারবৃন্দ ও ঢাকায় বসবাসরত আত্মিয়-স্বজন এবং শুভাকাঙ্খিদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হয় বিশেষ দোয়া মাহফিল। বিশেষ দোয়া মোনাজাত শেষে ফ্রিজিয়ান অ্যাম্বুলেন্সযোগে রাত সাড়ে ১০ টার দিকে লাশবাহি অ্যাম্বুলন্সেটি ঢাকা থেকে দামুড়হুদার উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসে।

 

আজ শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০ টায় দামুড়হুদা ব্র্যাকমোড়স্থ কেরুজ আখ সেন্টারের সামনে মরহুমার জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হবে বলে জানান নিহতের ভাই আশরাফুল আলম। ৬ ভাই ও ৩ বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন মেজো।

 

এ দিকে সফল জননীর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশের পাশপাশি শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন চুয়াডাঙ্গা-২ আসনের সংসদ সদস্য হাজি আলী আজগার টগর, দামুড়হুদা উপজেলা চেয়ারম্যান আলী মুনছুর বাবু, উপজেলা নির্বাহী অফিসার তাছলিমা আক্তার, উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা হোসনে জাহান ববি, দামুড়হুদা সদর ইউপি চেয়ারম্যান হযরত আলী, দামুড়হুদা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক বখতিয়ার হোসেন বকুল প্রমূখ।

 

উল্লেখ্য, জাহানারা হোসেনকে ২০২০ সালে একজন সফল জননী হিসেবে মনোনিত হন এবং জেলা প্রশাসক নজরুল ইসলাম সরকার তার হাতে পুরুষ্কার তুলে দেন। এ দিকে গতকাল বৃহস্পতিবার তাকে খুলনা বিভাগীয় পর্যায়ে সফল জননী হিসেবে মনোনিত করার লক্ষে তথ্য সংগ্রহের জন্য মহিলা বিষয়ক অধিদফতরের কর্মকর্তা তার বাড়িতে আসেন এবং বিভাগীয় পর্যায়ে সিলেকশনের বিষয়টি জানান। এমন সুসংবাদ পেয়ে কাঁন্নায় ভেঙ্গে পড়েন পরিবারের লোকজন।

প্রতিনিখিঃ বখতিয়ার হোসেন বকুল