সাহরির ফজিলত

সাহরি খাওয়া একটি সুন্নত আমল।রোজা রাখার নিয়তে, শেষ রাতে যে খাবার গ্রহণ করা হয় তাকে  সাহরি বলে।
এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আমল এবং এর অনেক ফজিলত ও বরকত রয়েছে। আমরা রোজাকে শুধুমাত্র একটি বরকতময় ও গুরুত্বপূর্ণ আমল বলে মনে করি, অথচ হাদীসে সাহরির অনেক  বরকত ও ফজিলত রয়েছে। এই আমলটির গুরুত্ব আমাদের না জানা থাকার কারণে, এই আমলটির ব্যাপারে আমাদের থেকে অনেক ভুল হয়ে থাকে।

 

সাহরির ব্যাপারে কিছু লোকের অভ্যাস হল যে, তারা সেহরীকে সুন্নত এবং বরকতের কারণ মনে করে না এবং সাহরি ছাড়াই রোজা রাখে। এবং গর্ব করে বলে আমি আজ “বিনা সাহরি” রোজা রেখেছি, অথবা তারা ঘুমানোর আগে মধ্যরাতে সাহরি খেয়েনেই অথচ দেরি করে সাহরি খাওয়া মাস্তাহাব। অনেকের কাছে ঘুম প্রিয় হওয়ার কারণে সাহরির বরকত থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাই আমাদের প্রথমে জেনে নিতে হবে সাহরিযর বরকত ও ফজিলত।
আসুন আমরা হাদীসের আলোকে সাহরির ফজিলত জেনে নেই।

 

১.সাহরি একটি বরকতময় খাবার।
হযরত আনাস ইবনে মালেক রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম এরশাদ করেছেন।
تسحوا فان في السحور بركة.
তোমারা সাহরি খাও, কেননা এতে বরকত রয়েছে।  (বুখারী: 1923) মুসনাদে আহমাদের বর্ণনায় বলা হয়েছে:
” السحور أكله بركة ، فلا تدعوه ، ولو أن يجرع أحدكم جرعة من ماء “
“সাহরি খাওয়াতে বরকত রয়েছে, তাই একে ছেড়ে দিবে না, যদিও তোমাদের কেউ এক ঢোক পানি পান করো।”(মসনদে আহমদ ১১০৮৬)
রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহরিকে غداء مبارك অর্থাৎ সকালের বরকতময় খানা বলে আখ্যায়িত করেছেন।
ইরবাস ইবনে সারিয়া রাঃ বর্ণনা করেন তিনি বলেন যে একবার  রাসূল সাল্লাল্লাহু ওয়া সাল্লাম রমজানে সাহরি খাওয়ার জন্য আমাকে আহ্বান করলেন এবং বললেন
هلم الى غداء المباركة
বরকতময় খাবারের দিকে এসো।”  (আবু দাউদ: 2344)
অন্য বর্ণনায় এসেছে:
عليكم بغداء السحور  فانه هو غداء المبارك.
তোমরা সেহরী খাওয়াকে গুরুত্ব দাও,কেননা এটি একটি বরকতময় খাবার (নাসায়ি ২১৬৪)

২সাহরি খানেওয়ালার প্রতি আল্লাহ এবং তাঁর ফেরেশতার রহমত বর্ষণ
সাহরি খানেওয়ালার প্রতি আল্লাহতালা রহমত বর্ষণ করেন এবং তার ফেরেশতা রহমতের দোয়া করে।
হযরত আবু সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন
” السحور أكله بركة ، فلا تدعوه ، ولو أن يجرع أحدكم جرعة من ماء “ ، فإن الله عزوجل وملائكته يصلون على المتسخرين “
“সাহরি খাওয়াতে বরকত রয়েছে, তাই একে ছেড়ে দিবে না, যদিও তোমাদের কেউ এক ঢোক পানি পান করো।” কেননা আল্লাহ তাআলা এবং তাঁর ফেরেশতা সেহরি খানেওয়ালার প্রতি রহমত বর্ষণ করেন(মসনদে আহমদ ১১০৮৬)
হযরত সায়েব  ইবনে ইয়াজিদ রাযিআল্লাহু তা’আলা আনহু বর্ণনা করেন রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন

” نعم السحور التمر ، وقال : يرحم الله المتسحرین “
উত্তম সাহরি হলো খেজুর খাওয়া এবং রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন আল্লাহ তায়ালা সাহরি খানেওয়ালার উপর রহমত বর্ষণ করেন।(তাবরানী কাবির ৬৬৮৯)

৩ সাহরি খানেওয়ালার জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু সালামের রহমতের দোয়া।
হযরত আবু সুওয়াইদ রাঃ বর্ণনা করেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহরি খানেওয়ালার জন্য রহমতের দোয়া করেছেন।(তাবরানী কাবির২২/৩৩৭)
কোন কোন রেওয়ায়াতে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঐ দোয়ার শব্দও উল্লেখ করা হয়েছে ।যা রসুল সাঃ সাহরি খানেওয়ালার জন্য করেছেন।
রসুল সাঃ এরশাদ করেন
اللهم صل على المتسحرين.
হে আল্লাহ সাহরি খানেওয়ালার উপর রহমত বর্ষণ করুন।(৩৭৫৮ الأحاد والمثاني)
উল্লেখিত দোয়ার মাধ্যমে পৃথিবীর সমস্ত সাহরি খানেওয়ালা জন্য দোয়া করা যেতে পারে।

৪.সাহরি খাওয়া রসুল সাঃ এর প্রিয় আমল
হযরত ইবনে মুহাইয়িজ রাঃ বর্ণনা করেন
” كان يستجب السحور ولو على جرع من ماء
রসুল সাঃ সাহরি খাওয়া পছন্দ করতেন  যদিও তা এক ঢোক পানি দ্বারা হোক না কেন।(আল মারাসিলু লি আবি দাউদ ৯৬)
উল্লেখিত হাদীসের আলোকে প্রত্যেক মুসলমানের জন্য সাহরি খাওয়া পছন্দনীয় এবং প্রিয় হওয়া উচিত। কেন না আশেকের কাছে মাশুকের প্রতিটি কাজ প্রিয় হয়ে থাকে।

 

৫.সাহরি এই উম্মতের জন্য বিশেষ বৈশিষ্ট্য

এক ব্যক্তি রসুল সাঃ এর কাছে আসলেন আর রসুল সাঃ সাহরি খাচ্ছিলেন, রসুল সাঃ এরশাদ করলেন

” إن السحور بركة أعطاكموها الله فلا تدعوها “
নিশ্চয়ই সাহরি একটি বরকতময় খাবার, তা আল্লাহ তায়ালা তোমাদেরকে দান করেছেন সুতরাং তোমরা তা কখনোই ছাড়বে না। (মসনদে আহমদ ২৩১৪২)
হযরত আমর ইবনে আস বর্ণনা করেন রসুল সাঃ এরশাদ করেন
” فصل ما بين صيامنا وصيام أهل الكتاب أكلة السحر “
আমাদের এবং আহলে কিতাবদের রোজার মধ্যে পার্থক্য হলো সাহরি খাওয়া। (মুসলিম শরীফ ১০৯৬)
এর দ্বারা বুঝা যায় যে সাহরি খাওয়া এই উম্মতের বৈশিষ্ট্য যা পুর্বে কোন উম্মতকে দেয়া হয়নি। ۔ ( الد یاج علی صحیح مسلم للسیوطی : 3/১৯৭ )
ইসলামের প্রাথমিক যুগে এই উম্মতের জন্যও এটাই নিয়ম ছিল, অর্থাৎ রাতে ঘুম থেকে উঠে খাওয়া-দাওয়া করা জায়েজ ছিল না।
ঘুমানোর আগে যা ইচ্ছা খেতে ও পান করতে পারতো , শুধু এটার অনুমতি ছিল।
কিন্তু পরবর্তীতে আল্লাহ তায়ালা এই উম্মতের উপর দয়া করে ভোরে উঠে সাহরি খাওয়াকে শুধু জায়েজই করেনি বরং মুস্তাহাব এবং পছন্দনীয় আমল হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।( مرقاة : 4 / 1381 ) ( عون المعبود : 6 / 305 )

 

৬.সাহরি খাওয়ার দ্বারা দিনে রোজা রাখার শক্তি অর্জন হয়
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাঃ রসুল সাঃ এর এই এরশাদ নকল করেন
استعينوا بطعام السحر على صيام النّهار ، وبقيلولة النّهار على قيام الليل “
দিনের রোজাকে সাহরি খাওয়ার মাধ্যমে এবং রাতের কিয়াম/ইবাদতকে কাইলুল্লাহ(দুপুরে খাবার পর শোওয়া) এর মাধ্যমে সাহায্য (শক্তিশালী কর) নাও।(মুসতাদ রাকে হাকেম ১৫৫১)
অন্য এক রেওয়ায়েতে এসেছে
من أحب أن يقوى على الصيام فليتسحر

 

যে রোজা রাখতে সক্ষম হতে চাই সে যেন সাহরি খায়।(শুয়াবুল ঈমান ৩৬২৮)
উল্লেখিত হাদীসের মাধ্যমে সাহরির ফজিলত।
মুফতী মাহমুদ হাসান।
সিনিয়র শিক্ষক: মুনিরুল উম্মাহ মাদ্রাসা যাত্রাবাড়ী,ঢাকা।