রোজা হাজারো রোগের চিকিৎসা (পর্ব-২)

রোজা হাজারো রোগের ঔষধ। মহান আল্লাহ তায়ালার ইবাদতের সাথে সাথে অগণিত শারীরিক উপকারিতা লাভ হয়ে থাকে রোজার মাধ্যমে। শুধু ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতেও রোজার রয়েছে বহুবিধ উপকারিতা। গতপর্বে আমরা বড় বড় ৯টি উপকারের কথা আলোচনা করেছিলাম। আজ আরো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উপকারিতা সম্পর্কে আলোকপাত করা হচ্ছে।

 

১০। রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখা : রোজায় সাধারণ খাদ্যাভ্যাস পরিহারের মাধ্যমে খাবারের সাথে অতিরিক্ত লবণ গ্রহণের মাত্রাও কমে যায়। এছাড়াও রেচন প্রক্রিয়ায় দেহের অতিরিক্ত লবণ বের হয়ে যায় বলে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে।

 

১১। অকাল বার্ধক্যের ঝুঁকি হ্রাস : রোজা রাখার ফলে আমাদের দেহের অপ্রয়োজনীয় কোষগুলো ধ্বংস হয় এবং পুনরায় দেহের জন্য প্রয়োজনীয় কোষ এবং টিস্যু গঠিত হয়। এই সাধারণ প্রক্রিয়ার ফলে দেহে কোলাজেন উৎপাদনের হার বৃদ্ধি পায় এবং দেহত্বক আরো উজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত হয়।

 

১২। মানসিক স্বাস্থ্যের বিকাশ নিশ্চিতকরণ : বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের মতে, রোজার ফলে মস্তিষ্কের সেরিবেলাম ও লিমরিক সিস্টেমের ওপর নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধির কারণে মনের অশান্তি ও দুশ্চিন্তা দূর হয়, যা উচ্চ রক্তচাপের জন্য মঙ্গলজনক। রোজার সামগ্রিক প্রক্রিয়ায় আমাদের দেহ এন্ডোরফিন নামক রাসায়নিক উপাদানে পরিপূর্ণ থাকে। এর ফলে আমাদের দেহে মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত হয় এবং দীর্ঘসময় পর্যন্ত আমাদের মন প্রফুল­ থাকে। তাছাড়া, রোজা রাখার ফলে এড্রেনাল গ্রন্থি থেকে উৎপাদিত কর্টিসল হরমোন এর হার তুলনামূলক ভাবে কমে যাওয়ায় একজন ব্যক্তি কম মানসিক চাপ অনুভব করেন। এর ফলে মন দুশ্চিন্তামুক্ত থাকে এবং ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।

 

১৩। বহুমূত্র রোগে কার্যকরী : বহুমূত্র রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে রোজা খুবই উপকারী। ডাক্তারী পরীক্ষায় দেখা গেছে, একাধারে ১৫-৩০ দিন রোজা রাখলে বহুমূত্র রোগের অত্যন্ত উপকার হয়।

 

১৪। খারাপ খাদ্যাভ্যাস থেকে মুক্তি : রোজা রাখার সাথে জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের বেশ দারুণ একটি সম্পর্ক আছে। প্রথমত, রোজা রাখার ফলে আমরা দীর্ঘসময় পর্যন্ত পানাহার থেকে বিরত থাকি। এর ফলে ধূমপান, জাংক ফুড এবং মদ্যপান থেকেও বিরত থাকা সম্ভব।
১৫। গ্যাসটিকের ব্যাথা প্রশমন : রোজা রাখলে অনেকটা সময় না খাওয়ার ফলে পাকস্থলীর এসিড নিঃসরণও কিছুটা কমে, ফলে গ্যাসট্রিকের ব্যাথাও কিছুটা হ্রাস পায়।

 

১৬। লিভার টনিকের কাজ করে : নোবেল পুরস্কার বিজয়ী মেডিসিন ও শল্য চিকিৎসার প্রখ্যাত ডাক্তার অ্যালেকসিস বলেছেন, উপবাসের মাধ্যমে লিভারে রক্ত সঞ্চালন দ্রুত হয়। এর ফলে ত্বকের নিচে সঞ্চিত চর্বি, পেশীর আমিষ, গ্রন্থিসমূহ এবং লিভারে কোষসমূহ আন্দোলিত হয়। অভ্যন্তরীণ দেহ যন্ত্রগুলোর সংরক্ষণ এবং হ্নদপিন্ডের নিরাপত্তার জন্য অন্য দেহাংশগুলোর বিক্রিয়া বন্ধ রাখে। এক কথায়, রোজা লিভার টনিকের কাজ করে।
১৭। কিডনী রোগে উপকারী : কিডনী সমস্যায় আক্রান্ত রোগীরা রোজা রাখলে এ সমস্যা আরো বেড়ে যাবে ভেবে রোজা রাখতে চান না। অথচ আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা বলছেন, রোজা রাখলে কিডনীতে সঞ্চিত পাথর কণা ও চুন দূরীভ‚ত হয়।

 

১৮। অজীর্ণ ও হাঁপানিতে কার্যকর : স্বাস্থ্যবিজ্ঞানী ডাঃ আব্রাহাম জে হেনরি রোজা সম্পর্কে বলেছেন, “রোজা হলো পরমহিতৈষী ওষুধ বিশেষ। কারণ, রোজা পালনের ফলে বাতরোগ, অজীর্ণ, হৃদরোগ ও রক্তচাপজনিত ব্যাধিতে মানুষ কম আক্রান্ত হয়।” গবেষণায় দেখা গেছে, রোজাদার পেপটিক আলসারের রোগীরা রোজা রাখলে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। হাঁপানি রোগীদের জন্যও রোজা উপকারী।
১৯। ফুসফুসের রোগ সারাতে সক্ষম : বিশ্বখ্যাত চিকিৎসা বিজ্ঞানী নাষ্টবারনার প্রমাণ করেছেন যে, ফুসফুসের কাঁশি, কঠিন কাঁশি, সর্দি এবং ইনফ্লুয়েঞ্জা কয়েকদিনের রোজাতেই নিরাময় হয়। করোনা ভাইরাসও যেহেতু সর্দি-ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো একটি রোগ, সে কারণে করোনা নিয়ন্ত্রণেও রোজার যে ভূমিকা থাকবে সেটা গবেষণা না করেও বলা যায়।

 

ছোট-খাটো অজুহাত দেখিয়ে আমরা অনেকেই রোজা রাখি না। কিন্তু রোজার উপকারিতা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করেই ২০১৬ সালে চিকিৎসা বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন জাপানি জীব বিজ্ঞানী ইয়োশিনরি ওসুমি। মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে রোজা রাখার তৌফিক দান করুন।
লেখক : মৎস্যবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়।