পদ্মা সেতুর সুবাতাস সুন্দরবনে, বাড়বে পর্যটক ও রাজস্ব আয়

নতুন সূর্য। নতুন সকাল। সাথে দীর্ঘদিনের পুঞ্জিবিত স্বপ্নও হলো সত্যি। চালু হলো পদ্মা সেতু। পাল্টে যাবে সব কিছু। সময়ের সাথে কমবে ভোগান্তি। এরই মধ্যে এই সেতুর সুবাতাস বইতে শুরু করেছে বিশ^ ঐতিহ্য ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন কেন্দ্রিক পর্যটন শিল্পে। ভৌগলিকভাবে সুন্দরবনের কোলে অবস্থান হওয়ায় একমাত্র বাগেরহাটের মোংলা উপজেলা থেকেই সড়ক পথে সুন্দরবন দেখা যায়। তাই স্বল্প খরচে সুন্দরবনকে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন রুপে দেখার সুযোগ কেবল মোংলাতে রয়েছে।

 

জানা গেছে, পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় এখন সড়কপথে দেশের যেকোন প্রান্ত থেকে মোংলা হয়ে সরাসরি যাওয়া যাবে সুন্দরবনে। যে সুযোগ আর কোথাও পাওয়া যাবেনা। এটি ভ্রমন পিপাসু পর্যটকদের জন্য একটি আকর্ষণীয় বিষয়। ফলে ভ্রমন মৌসুমে সুন্দরবনে পর্যটকদের সংখ্যা বাড়বে। সমৃদ্ধ হবে সুন্দরবন বিভাগের অর্থনীতি।

 

পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় বনকর্মকর্তা (ডিএফও) মুহাম্মদ বেলায়েত হোসেন বলেনকারন , ২০২১-২২ অর্থ বছরে সুন্দরবনে পর্যটক এসেছে এক লাখ ২০ হাজার জন। এখান থেকে সুন্দরবন বিভাগের রাজস্ব আয় হয়েছে এক কোটি ২৫ লাখ টাকা। পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় সুন্দরবনে ব্যপক পরিবর্তন আসবে। পর্যটকদের সংখ্যা যেমন বাড়বে তেমনি রাজস্বও বাড়বে বলে এই বন কর্মকর্তা জানান।

 

তিনি বলেন, ইতোমধ্যে পর্যটকদের চাপ সামলাতে পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের করমজল, হারবাড়িয়া, কটকা, কচিখালী ও দুবলা এবং পশ্চিম বিভাগের হিরন পয়েন্ট ও কলাগাছিয়া এই সাতটি ইকোট্যুরিজমের সাথে নতুন আরও চারটি ইকো ট্যুরিজম কেন্দ্র যোগ করা হচ্ছে। সুন্দরবন ইকো ট্যুরিজম প্রকল্পের আওতায় ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের আন্ধারমানিক, শরণখোলা রেঞ্জের আলী বান্দা এবং পশ্চিম বিভাগের সাতক্ষীরা রেঞ্জের শেখের টেক ও কালাবগিতে নতুন এই ট্যুরিজমগুলো নির্মাণ করা হবে বলেও জানান তিনি। এসব ইকো ট্যুরিজমে পর্যটকদের সুব্যবস্থার জন্য জন্য গোলঘর, ফুটট্রেলার,পাবলিক শৌচাগার, ওয়াচ টাওয়ার ও রাস্তা করা হবে।

 

বনকর্মকর্তা বেলায়েত হোসেন বলেন, যেকোন পর্যটন হোক বা ইকো ট্যুরিজম হোক তার মধ্যে অন্যতম সুবিধা হচ্ছে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি। দীর্ঘদিন সুন্দরবন কেন্দ্রিক যে ইকো ট্যুরিজমে পর্যটকরা আসতো, তারা সব সময় যোগযোগ ব্যবস্থা উন্নত না থাকার কারণে এখানে আসার অনীহা প্রকাশ করতো। কিন্তু এখন সেতু যেহেতু চালু হয়েছে তাই অতিরিক্ত পর্যটকদের ঢল নামবে। তাই পর্যটকদের চাপ সামলাতে নতুন চারটিসহ মোট ১১ টি ইকো ট্যুরিজম কেন্দ্র থেকে সেবা দেওয়া যাবে বলেও জানান তিনি।

 

সুন্দরবনের ট্যুরিজম ব্যবসায়ী গোলাম রহমান বিটু বলেন, যোগাযোগ ব্যবস্থা ভাল না থাকায় অধিকাংশ সময় পর্যটকরা সুন্দরবনে আসতে চাইতো না। এখন যেহেতু পদ্মা সেতু চালু হয়েছে তাই সেই চিরচেনা চিত্র একেবারেই পাল্টে যাবে।

যোগাযোগ ব্যবস্থার দূরত্ব কমে সহজ হওয়ায় এখন পর্যটকদের আকর্ষনও বাড়বে বলে
মনে করেন তিনি।

 

সেভ দ্য সুন্দরবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় উচ্ছ¡াসিত সুন্দরবন সংলগ্ন স্থানীয়রাও। তিনি বলেন, সুন্দরবনের কাছেই আমাদের বসবাস। ফলে বনকেন্দ্রিক
পর্যটন শিল্পের সঙ্গে আমাদের অনেকেই জড়িত। পদ্মা সেতুর দ্বার উন্মোচনের পাশাপাশি সুন্দরবনের বিভিন্ন পয়েন্টে অবকাঠামো ও যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নতি হলে দর্শনার্থীরাও আনন্দ পাবেন।

 

পূর্ব সুন্দরবনের করমজল বণ্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাওলাদার আজাদ কবির জানান, ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার বাংলাদেশ অংশে জলভাগের পরিমান ১৮৭৪ দশমিক ১ বর্গকিলোমিটার। যা সমগ্র সুন্দরবনের আয়তনের ৩১ দশমিক ১৫ ভাগ। এই বনে বাঘ, হরিণ, বানরসহ ৩১৫ প্রজাতির বণ্যপ্রাণী এবং সুন্দরী, বাইন, গরানসহ ৩৩৪ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে। মূলত এসব দেখতেই প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ভ্রমন পিপাসুরা ছুটে আসেন। তবে যোগাযোগ ব্যবস্থা অনোন্নুত হওয়ায় মাঝে মাঝে মৌসুমেও পর্যটকদের ভাটা পড়ত। এখন সেতু চালু হওয়ায় পর্যটক বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সুন্দরবনের এ খাত থেকে রাজস্ব আয় হবে চার থেকে পাঁচ গুন।