‘ক্রাইম সিরিয়াল’দেখে স্ত্রীর সঙ্গে পরকীয়া সন্দেহে বন্ধুকে হত্যা

সাব্বির হোসেন (২২) গার্মেন্টেসে চাকরির সুবাদে স্ত্রী সাথীকে নিয়ে আশুলিয়ার জামগড়া এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। গ্রামের বন্ধু জয়নাল (২০) সাব্বিরের বাসায় গেল মে সাবলেটে ওঠে। কিন্তু দু মাস না যেতেই স্ত্রীর সঙ্গে জয়নালের সুসম্পর্ককে পরকীয়া সন্দেহে মনোমালিন্য হয়। এর জেরে স্ত্রীকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। পরে গ্রাম থেকে আরও দুই বন্ধুকে ডেকে এনে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী গত ১৪ আগস্ট শ্বাসরোধ করে জয়নালকে হত্যা করে।

হত্যায় জড়িতরা জানিয়েছেন, পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী শ্বাসরোধে হত্যার পর লাশ গুম করার জন্য একটি পানির ড্রামের মধ্যে ফেলে দরজা বন্ধ করে বাসায় তালা দিয়ে পালিয়ে যায়। আর এ হত্যার পরিকল্পনা তারা করেন টিভি এবং মোবাইল ফোনে অপরাধ সংক্রান্ত বিদেশি সিরিয়াল দেখে। গ্রেফতার এড়াতে ব্যবহৃত মোবাইল ফোনও বন্ধ রাখেন তারা।

ওই চাঞ্চল্যকর ক্লুলেস হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষিতে র‌্যাব-১ তাৎক্ষণিকভাবে নিহত অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির পরিচয় শনাক্ত এবং হত্যাকারীদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনতে দ্রুততার সঙ্গে ছায়া তদন্ত শুরু করে।

র‌্যাব-১ এর একটি তদন্ত সংশ্লিষ্ট দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন ঘটনার রহস্য উদঘাটনে বিশ্বস্ত সোর্স নিয়োগ করে। সোর্সের মাধ্যমেই ওই বাসায় সচরাচর যাতায়াতকারী সন্দেহভাজন আনোয়ার হোসেন (২০) কে নাটোরের গুরুদাসপুর থেকে অভিযান পরিচালনা করে গ্রেফতার করে র‌্যাব। আনোয়ারের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে খুলতে থাকে ওই ক্লুলেস মামলার জট।

আনোয়ার জানায়, একই গ্রামের তার প্রতিবেশী ভিকটিম জয়নাল। গত ১৪ আগস্ট থেকে তার বাবা-মা তার সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করতে পারছিল না। এছাড়া র‌্যাব জানতে পারে, ভিকটিম জয়নাল তার গ্রামের প্রতিবেশী আব্দুস সুকুরের ছেলে সাব্বির হোসেনের সঙ্গে ঢাকার আশুলিয়ায় একই বাসায় সাবলেটে বসবাস করে।

এরই ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার (৩১ আগস্ট) ভোরে র‌্যাব-১ এর দল হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহভাজন সাব্বির হোসেন (২২), আনোয়ার হোসেন (২০) ও সুরুজ আলী (১৮) কে আটক করে।

র‌্যাব-১ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল আব্দুল মোত্তাকিমের দাবি, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জয়নাল হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তারা সরাসরি জড়িত বলে স্বীকার করেছে এবং কঙ্কালপ্রায় গলিত মরদেহটি জয়নালের বলে নিশ্চিত করেছে।

জিজ্ঞাসাবাদ ও ঘটনার বিবরণে জানা যায়, সাব্বির হোসেন (২২) ও সাথী (১৭) স্বামী-স্ত্রী। সাব্বির আশুলিয়ার একটি গার্মেন্টেসে চাকরির সুবাদে স্ত্রীকে নিয়ে আশুলিয়ার জামগড়া এলাকায় গত ফেব্রুয়ারি থেকে ইদ্রিস কাজীর ৫ম তলা বাসার ৩য় তলায় দুই রুমের একটি ফ্ল্যাটে বসবাস শুরু করে। নিহত জয়নাল (২০) এবং সাব্বির গ্রামের বন্ধু হওয়ায় সে সাব্বিরের ভাড়া বাসায় মে মাস থেকে সাবলেট হিসেবে বসবাস করতে থাকে। একই বাসায় বসবাসের ফলে সাব্বিরের স্ত্রীর সঙ্গে জয়নালের সুসম্পর্ক তৈরি হয়, যা সাব্বির বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক হিসেবে সন্দেহ করে।

dhakapost

একপর্যায়ে তাদের মধ্যে মনোমালিন্যের সৃষ্টি হয়। এর জের ধরে গত জুন মাসে সাব্বির তার স্ত্রী সাথীকে শ্বশুর বাড়ি লালমনিরহাটে পাঠিয়ে দেয়।

এরপর সাব্বির জয়নালকে হত্যার পরিকল্পনা করে। হত্যা-পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সাব্বির জয়নালকে চাকরি দেওয়ার কথা বলে আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে পুনরায় তার ভাড়া বাসায় নিয়ে আসে। জয়নালকে হত্যায় সহযোগিতার জন্য গ্রামের বন্ধু আনোয়ার এবং সুরুজকে নিয়ে আসে সাব্বির।

১৪ আগস্ট রাত ১১টার দিকে সাব্বির ভিকটিম জয়নালকে আশুলিয়ার জামগড়া এলাকায় তার ভাড়া বাসায় পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী আনোয়ার এবং সুরুজের সহায়তায় গলাটিপে হত্যা করে। গুমের উদ্দেশে বাসার একটি পানির ড্রামের মধ্যে জয়নালের লাশ ফেলে দরজা বন্ধ করে বাসায় তালা দিয়ে তিন জনই পালিয়ে যায়।

জিজ্ঞাসাবাদে আরও জানিয়েছে, অপরাধ সংক্রান্ত বিদেশি সিরিয়াল দেখে এ হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করেছিল তারা। হত্যার পর সিরিয়ালের ন্যায় তারা গ্রেফতার এড়ানোর লক্ষ্যে তাদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনও বন্ধ রাখে। আসামিদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ প্রক্রিয়াধীন বলে জানিয়েছে র‌্যাব।