গাংনী; ওদের চোখে আনন্দ অশ্রু

এখন আর স্কুলে যেতে কোন কষ্ট হবে না। বাপের কাছে টাকার জন্য আর হাতও পাততে হবে না। সাইকেলে চড়ে স্বাচ্ছন্দে স্কুলে যেতে পারবো। বান্ধবীদের সাথে ঘুরতেও পারবো। এমনি মনের আবেগ প্রকাশ করছিল চাঁদপুর গ্রামের দিনমজুর ফজলুর রহমানের মেয়ে রাইপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী মৌমিতা। প্রতিদিন বিদ্যালয়ে যাতায়াত খরচ লাগে ত্রিশ টাকা। দিনমজুর পিতার কাছ থেকে প্রতিদিন যাতায়াত খরচ চেয়ে নিতে হতো। টাকার অভাবে মাঝে মধ্যে পায়ে হেটে তিন কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে বিদ্যালয়ে যেতে হতো। এখন আর কোন কষ্ট রইল না তার।

শুধু মৌমিতা নয়, তার মতো রাইপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন বিদ্যালয়ের ৭২ জন ছাত্রীর চোখে মুখে আনন্দের ছোঁয়া। অনেকেরই অনুভুতি প্রকাশের সময় চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ে আনন্দ অশ্রু। অভিভাবকরাও বেশ আনন্দিত। সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রী শিরিন শিলার বাবা মকলেসুর রহমান জানান,তার তিন মেয়ে লেখাপড়া করে। সংসারের খরচের পাশাপাশি মেয়েদের যাতায়াতের খরচ দেয়া বেশ কষ্ট সাধ্য। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে মেয়েকে সাইকেল দিয়েছে। এখন আর বাড়তি টাকা খরচ হবে না। ওই টাকা দিয়ে ওদের মুখে খাবার তুলে দেয়া হবে।

শিক্ষার্থীরা জানান, অনেকের বাবা মা গরীব। তাদের সংসার চালঅতেই কষ্ট তার উপর যাতায়াতের জন্য বাড়তি খরচ। এসব চিন্তা ভাবনা ভাল লাগতো না। মাঝে মধ্যে তারা দল বেঁধে পায়ে হেটে বিদ্যালয়ে যেতো। পড়তে হতো বিড়ম্বনায়। এখন একজন অপর জনকে সাথে নিয়ে অনায়াসে বিদ্যালয়ে যেতে পারবে। বাই সাইকেল তাদের পড়ালেখাকে একধাপ এগিয়ে দিল বলেও মন্তব্য করেছেন তারা।

রাইপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মিজানুর রহমান বলেন, বাইসাইকেল পেয়ে নারী শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরো ত্বরান্বিত করবে। অনেকেই দুর দুরান্ত থেকে বিদ্যালয়ে আসে। সময় মতো যানবাহন না পাওয়ায় অনেকে দেরীতে বিদ্যালয়ে পৌঁছাতো। আবার অনেকে পায়ে হেটে আসার কারণে ক্লান্ত হয়ে পড়তো। বাড়িতে গিয়েও ঠিকমতো পড়ালেখা করতে পারতো না। এখন আর তাদের সমস্যা হবে না।

এ ব্যাপারে রাইপুর ইউপি চেয়ারম্যান গোলাম সাকলায়েন ছেপু জানান, অনেক দরীদ্র পরিবারের মেধাবী শিক্ষার্থী আছে যারা অর্থাভাবে বিদ্যালয়ে যেতে পারে না আবার গরীব বাবা মার কাছে টাকা নিয়ে বিদ্যালয়ে আসতে কুণ্ঠাবোধ করে। তাছাড়া মেধাবী শিক্ষার্থীরা উপহার পেলে অনেকেই উপহারের আশায় আগ্রহ নিয়ে পড়াশোনা করবে । এসব চিন্তা মাথায় রেখেই শিক্ষার্থীদের মাঝে সাইকেল বিতরনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সে অনুযায়ি ২০২০-২০২১ অর্থ বছরের এলজিএসপি-৩ প্রকল্পের ছয় লক্ষ টাকা ব্যায়ে ৭২ টি বাইসাইকেল ক্রয় করে শিক্ষার্থীদের মাঝে বিতরণ করা হয়।

গাংনী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মৌসুমী খানম বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ থেকে যে সাইকেল বিতরণ করা হয়েছে, এতে শিক্ষার্থীদের মনোবল বৃদ্ধি পাবে এবং নারী শিক্ষার প্রসার ঘটবে। অনেক শিক্ষার্থী সময় মতো বিদ্যালয়ে আসতে পারে না আবার পায়ে হেটে আসার সময় নানা বিড়ম্বনায় পড়ে। এখন বান্ধবীরা এক সাথে সাইকেল চড়ে আসলে কেউ উত্যক্ত করতে পারবে না। অনেকেই আগ্রহী হয়ে ভালভাবে পড়াশোনা করবে। ইউপি চেয়ারম্যানের এটি একটি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।