মেহেরপুর; পরকীয়ায় ভাংছে সোনার সংসার ও রঙিন স্বপ্ন

মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার কুঞ্জনগর গ্রামের ছৈরদ্দীনের ছেলে দুলাল হোসেন। সংসারের রয়েছে দুই মেয়ে ও এক ছেলে। মোবাইল ফোনের মিস কলের সুত্র ধরে পরিচয় ঘটে নতুন পাড়ার রফিকুলের স্ত্রীর সাথে। বেশ কিছু দিন স্বামির অনুপস্থিতি সেই সাথে দুলালের মিষ্টি কথায় শুরু হয় মন দেয়া নেয়া। অবশেষে দুজনেই পাড়ি জমিয়েছে একে অপরের হাত ধরে।

 

এদিকে সর্দার পাড়ার আসমতের স্ত্রী বিদেশ গেছেন বছর দেড়েক আগে। সংসারের অভাব ঘোচাতে কোলের শিশু সন্তানকে ফেলে বিদেশ গেলে আসমত ফরিদপুরে কাজের সন্ধানে যায়। সেখানে নিজেকে ধনী লোক ও অবিবাহিত পরিচয় দিয়ে এক বিবাহিত নারীর সাথে পরোকীয়ায় জড়িয়ে পড়ে। অবশেষে বিয়ের পিঁড়িতে বসেছে দুজন।

 

শুধু দুলাল কিংবা আসমত নয়, তার মতো সর্বনাশা প্রেম ও পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ছে মেহেরপুরের গাংনীর অনেকেই। প্রেম পরোকীয়া মাদক আসক্তির চেয়েও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে এখানে। হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ছে পরকীয়া প্রেমিক-প্রেমিকা। ভেঙ্গে যাচ্ছে সোনার সংসার ও রঙিন স্বপ্ন।

 

স্থানীয় জনতা ও পুলিশের হাতে আটক পরকীয়া জুটির জবানবন্দীতে বেরিয়ে এসেছে নানা চাঞ্চল্যকর ও মর্মান্তিক কাহিনী। এসব ঘটনার কোন তদন্তই হয় না। সামাজিক বিচারে কয়েকজন সংসারে ফিরে গেলেও সিংহভাগ হারিয়েছে সোনার সংসার। অনেকেই বেছে নিয়েছে আত্মহত্যার পথ।

 

প্রেম ও পরোকীয়ায় জড়ানোর ব্যাপারে পাওয়া গেছে বিচিত্র সব তথ্য। সংসারে স্বামী বা স্ত্রীর অনুপস্থিতি, অশান্তি, দাম্পত্য কলহ, নিজেকে নিঃসঙ্গ ভেবে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ছে অনেকেই। সামান্য পরিচয়ের সুত্র ধরে সম্পর্ক তৈরি ও নিজেকে সিঙ্গেল দাবি করে ছেলে মেয়েরা বিয়ের প্রলোভনে অনৈতিক সম্পর্ক তৈরী করছে। বিশেষ করে ফেসবুক ও মোবাইল ফোন পরকীয়া করাকে খুবই সহজ করে দিয়েছে। পরকীয়ায় জড়ানোর ক্ষেত্রে জীবনসঙ্গীর চোখের আড়ালে সুযোগ বুঝে নিজেকে সিঙ্গেল পরিচয় দিয়েও পরকীয়া করেন অনেক মানুষ। নিজের সম্পর্কে মিথ্যা কাহিনী তৈরি করে বিপরীত লিঙ্গকে আকর্ষণ করে। এক সময় দুজন দুজনের প্রকৃত ঘটনা জানার পরও জৈবিক চাহিদার উন্মাদনার কারণে প্রেমে আগ্রহী হয়ে ওঠে।

 

গাংনী উপজেলার একটি পৌরসভা ও নয়টি ইউনিয়নে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত তিন মাসে ২৪২ টি সালিশ অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে ১৮৯ টি বিবাহ বিচ্ছেদ স্ত্রী নির্যাতন ও দ্বিতীয় বিয়ের ঘটনা যার নেপথ্যে পাওয়া গেছে পরোকীয়া প্রেম। এসব সালিশে ৫৫ জন স্বামীর ঘর ফিরে পেলেও বাকীদের ভেঙ্গেছে সোনার সংসার। অনেকের মামলা আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। আবার অনেকেই পিতামাতার অবস্থা বিবেচনা করে নির্যাতন সইয়ে স্বামীর সংসারে রয়েছেন।

 

বামন্দীর বিশিষ্ট নিকাহ রেজিস্টার সোহেল রানা বাবু জানান, বিয়ের সময় কাগজ পত্রের জটিলতা এড়াতে ছেলে মেয়েরা অধিকাংশ নিজেকে কুমার-কুমারী দাবী করে। আবার অনেকেই বিধবা পরিচয় দিয়ে বিবাহ রেজিস্ট্রি করতে আসেন। তাদের অবিবাহিত বা কুমারীত্ব প্রমাণের কোন সুযোগ থাকে না। তথ্য গোপন করলেও তাৎক্ষনিকভাবে যাচাই সম্ভব হয় না। তিনি আরো জানান, তালাক প্রদানের পর সরকারী নিয়মানুযায়ি স্থানীয় চেয়ারম্যান বা পৌর মেয়রের কাছে নোটিশ প্রদান করতে হবে। সেই সাথে স্বামী স্ত্রীকে নোটিশ পাঠাতে হবে। নোটিশ প্রাপ্তির ১০০ দিন পর তালাক নামা কার্যকর হবে। অথচ ছেলে মেয়েরা তথ্য গোপন করায় এ আইন কার্যকর হচ্ছে না।

 

বেশ কয়েকজন পুৃলিশ কর্মকর্তা জানান, যতগুলো পরকীয়া প্রেমের টানে ঘর ছাড়ার ঘটনা ঘটেছে এবং পুলিশের হাতে যারা আটক হয়েছে তার সব কয়টি স্থানীয় সমাজ পতি এবং প্রেমিক প্রেমিকা জুটির পরিবারের লোকজন নিজ জিম্মায় নিয়েছে। তবে কয়েকটি ধর্ষণের মামলা হয়েছে সেগুলো প্রক্রিয়াধীন। প্রেমিক জুটির পরিবারের লোকজন কেউ মামলা চালাতে চান না আবার অনেকেই নিজ সংসারে ফেরত যাবার জন্য আইনের আশ্রয় নিতে চান না। এক্ষেত্রে পুলিশের কিছুই করার থাকেনা। সবার আগে নৈতিকতা শিক্ষা ও প্রযুক্তির যুগে নেতিবাচক শিক্ষা পরিহার করে ইতিবাচক শিক্ষা গ্রহন আবশ্যক।

 

মটমুড়া ইউপি চেয়ারম্যান সোহেল আহমেদ জানান, স্থানীয়ভাবে সালিশ বৈঠকে পরোকীয়া জুটিরা নানা ধরনের তথ্য জানিয়েছেন। অনেকের স্বামী বিদেশে অবস্থান করছেন। তাদের স্ত্রীরা বিভিন্ন মার্কেটে কেনা কাটা করতে গিয়ে অন্যের সাথে পরিচিত হন। তাছাড়াও ফেসবুক, ইমু, টুইটার হোয়াট্স আপে পরিচয় ঘটে অন্য যুবকদের সাথে। তার পরে তারা জড়িয়ে পড়ে পরোকীয়ায়। আবার অনেক পরিবারের স্বামী স্ত্রী দুজনই চাকরী করেন। কর্মস্থলে দুজনই বিপরীত লিঙ্গের মানুষের সাথে পরোকীয়ায় জড়িয়ে পড়েন। কেউ বা ঘর ভাঙছেন । আবার কেউ বা একই ছাদের নীচে বসবাস করেন বিষময় জিবন। একই কথা জানিয়েছেন রাইপুর ইউপি চেয়ারম্যান গোলঅম সাকলায়েন ছেপু এবং ষোলটাকা ইউপি চেয়ারম্যান মনিরুজ্জামান।

 

গাংনী মহিলা ডিগ্রী কলেজের বাংলা বিভাগীয় প্রভাষক রমজান আলী বলেন, মানুষের নীতি-নৈতিকতা এবং মূল্যবোধ নষ্ট হওয়ার কারণে পরকীয়া, খুন হত্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। নষ্ট হচ্ছে আত্মীয়তার সর্ম্পক। অপসংস্কৃতি চর্চায় মানুষের চাহিদা দিনে দিনে বৃদ্দি পাচ্ছে। ফলে স্বামী-স্ত্রীরা বিদ্যমান সর্ম্পকের বাইরে গিয়ে অন্য মানুষের সঙ্গে সর্ম্পকে তৈরি করছে। ফলে সোনালী সংসার ভেঙ্গে যাচ্ছে। এ থেকে রেহাই পেতে ভবিষ্যত প্রজন্মকে নৈতিক শিক্ষা ও সামাজিক মূল্যবোধ শেখাতে হবে। সেই সাথে ইন্টারনেটের অপব্যবহার বন্ধ করতে হবে বলে জানান তিনি।