শুভ’র হাতে বই নয়, উঠেছে স্ক্রু ড্রাইভার

মোঃ রাজু ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি

স্কুলে তো যেতে চাই। এবার আমি ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হয়েছি, বইও আছে আমার। বন্ধুদের যখন স্কুল যেতে দেখি, তখন আমারও স্কুলে যেতে খুব ইচ্ছে করে।’

 

মোটরসাইকেলের স্ক্রু টাইট দিতে দিতে এভাবেই পড়ালেখার প্রতি আগ্রহের কথা জানাল শুভ। মুখে নজরকাড়া মুচকি হাসি নিয়ে শুদ্ধ ভাষায় বেশ গুছিয়ে কথাগুলো বলে ১১ বছর বয়সী শিশুটি।

 

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার বাসস্ট্যান্ড বাজারের মোটরসাইকেল মেকারের গ্যারেজে কাজ করে শুভ। গ্রাহক গাড়ি নিয়ে গেলে সেই গাড়িটি গ্যারেজে ঢোকানো, গাড়ি ধোয়ামোছা করা ও ওস্তাদের সঙ্গে ছোট ছোট কাজে হাত লাগানো তার দায়িত্ব। দিনশেষে পারিশ্রমিক ৬০ টাকা। যে বয়সে হাতে থাকবে বই, কাঁধে স্কুলব্যাগ, সেই বয়সে তার হাতে স্ক্রু ড্রাইভার।

 

শুভ জানায়, জেলা সদরের জগন্নাথপুরে বাসা তার। পড়ালেখা করে বড় চাকরি করার ইচ্ছে ছিল। পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত পড়েওছে সে। করোনার সময় তার বেশকিছু বন্ধুর মতো তাকেও কাজে লাগিয়ে দেন তার দিনমজুর বাবা। তবুও স্কুলে ভর্তির সুযোগ পেয়ে ঘরে না জানিয়ে ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হয় শুভ। কিন্তু সংসারে যে অভাবের গাঢ় ছায়া, কীভাবে পড়াশোনা করবে শুভ?
কথা হয় শুভর বাবা কালিদাসের সঙ্গে। তিনি বলেন, পড়ালেখার এত টাকা কথায় পাব। তাছাড়া কাজ শিখলে নিজেও চলতে পারবে, সংসারে সহযোগিতাও করতে পারবে।

 

তিনি আরো জানান, শুভ যা আয় করে তা দিয়ে সংসারে কিছুটা সহযোগিতা হয়। স্কুলে গেলে কে দেবে সেই টাকা। পড়ালেখা ধনীদের জন্য গরিবের জন্য নয়।শুভর মতো পাশের দুটি মেকারের দোকানেও আদিত্য ও সজীব নামে দুই শিশুকে কাজ করতে দেখা যায়। তারা পঞ্চম ও ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ে। তাদের কাহিনীও অনেকটা শুভর মতো। করোনাকালে কাজে ঢোকার পর আর স্কুলে ফিরে যেতে পারেনি তারা।

 

 

শিশুশ্রম নিয়ে কথা হয় একটি মোটরসাইকেল গ্যারেজের মালিক দিনেশের সঙ্গে। তিনি জানান, তার গ্যারেজে সবসময় শিশুরা কাজ করে। নিজেও শিশুকাল থেকেই কাজ করে আসছেন। কখনো শোনেননি শিশুরা কাজ করতে পারবে না। তাছাড়া কাউকে তিনি কাজ করতে জোর করেননি। শিশু ও শিশুর পরিবারের কথাতেই তাদের কাজ দিয়েছেন দিনেশ।

 

শিশুদের নিয়ে কাজ করা সমাজসেবী হেলেনা পারভিন মনে করেন, দারিদ্র্যের কশাঘাত ওদের (শিশুদের) শ্রেণীকক্ষে যেতে বারণ করে। আর করোনা এ দরিদ্রতায় যোগ করেছে নতুন মাত্রা। অনেকের স্কুলে যাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও সম্ভব হয় না। সরকারের পক্ষ থেকে উপবৃত্তির টাকা, বিনামূল্যে বই ওদের জন্যও বরাদ্দ থাকে। এসব অনুদান নিয়েও পরিবারের প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটাতে কাজে নামে শিশুরা। স্কুলে যাওয়ার বদলে যেতে হয় হাট-বাজারে। খেলার মাঠে যাওয়ার বদলে যেতে হয় কাজে।হেলেনা পারভিন বলেন, সরকারকে শিশুশ্রম বন্ধ করতে আরো তৎপর হতে হবে। তাদের শিক্ষা ও বিনোদন নিশ্চিত করতে বিশেষ নজর দিতে হবে। পাশাপাশি দেশের বিত্তশালীরা যদি এসব পরিবারের সন্তানদের কিছু কিছু করে দায়িত্ব নিতে আগ্রহী হন, তাহলে শিশু অধিকার রক্ষায় দেশ এগিয়ে যাবে।