কটিয়াদীর ঐতিহ্যবাহী ঢাকঢোল ও বাঁশির হাট

মিয়া মোহাম্মদ ছিদ্দিক, কটিয়াদী(কিশোরগঞ্জ)প্রতিনিধিঃ

কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার পুরান বাজারে শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে প্রতিবারের মতো এবারো ঐতিহ্যবাহী ঢাকঢোলের হাট বসেছে।প্রায় ৫০০ বছরের এ হাটকে ঘিরে এলাকা সরগরম হয়ে উঠেছে।

 

বাদ্যযন্ত্রসহ পছন্দের ঢাকিদের বেছে নিতে বিভিন্ন এলাকার পূজামন্ডুপের লোকজন হাটে ভিড় করছেন।শনিবার বিকাল থেকে শুরু হওয়া এহাট সপ্তমী পূজা পর্যন্ত চলবে।বৃহত্তর ময়মনসিংহ,সিলেট,ঢাকা,বি-বাড়িয়া,নরসিংদী,গাজীপুর,নারায়নগঞ্জ,কুমিল্লাসহ বিভিন্ন অঞ্চল বিপুল সংখ্যক পূজা আয়োজক এই হাট থেকে বাদ্যযন্ত্রীদের পূজার দু-একদিন আগে বায়নায় নিয়ে যান।এ হাটে ঢাক,ঢোল,কাঁঁসি সানাই,ঝনঝনি বিভিন্ন ধরনের বাঁশিসহ হাজার হাজার বাদ্যযন্ত্রের পসরা বসে। নেচে গেয়ে বাদ্যযন্ত্রীরা গ্রাহকদের আকৃষ্ট করে থাকেন।

 

সাধারণত একটি ঢাক ১২ থেকে ১৫ হাজার, ঢোল ১০-১২ হাজার, বাঁশি প্রকারভেদে ১০ থেকে ২০ হাজার, ‘ব্যান্ডপার্টি’ ছোট ৩০ হাজার থেকে ৫০ হাজার এবং বড় ৬০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত ভাড়া হয়।
জনশ্রæতি রয়েছে ষোড়শ শতাব্দির মাঝামাঝি স্থানীয় সামন্ত রাজা নবরঙ্গ রায় সর্বপ্রথম তার রাজপ্রাসাদে দূর্গাপূজার আয়োজন করেন।উপজেলা সদর থেকে দুই কিঃ মিঃ উত্তরে চারিপাড়া গ্রামে ছিল রাজ প্রাসাদ।

 

পূজা উপলক্ষে রাজপ্রাসাদ থেকে বিভিন্ন স্থানে বার্তা পাঠানো হয় ঢাকঢোলে,বাঁশিসহ বাদ্যযন্ত্রীদের আগমনের জন্য।সে সময় নৌপথে বাদ্যযন্ত্রীরা কটিয়াদী- মঠখোলা সড়কের পাশে পুরাতন নদের তীরে যাত্রাঘাট নামক স্থানে পূজার দুইদিন আগে আসতেন।পরে পার্শ্ববতী মসুয়া গ্রামের বিশ্বনন্দিত চলচিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের পূর্বপুরুষ হরি কিশোর রায় চৌধুরীর বাড়িতে মহাধুমধামে পূজা শুরু হয়।সেই সঙ্গে পূজায় বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের প্রতিযোগিতা চলে।দিন দিন পূজার সংখ্যা বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন জমিদারের মধ্যে ঢাকের হাটের স্থান নির্ধারন নিয়ে দ্ব›দ্ধ শুরু হয়।অবশেষে স্থান পরিবর্তন করে আড়িঁয়াল খা নদের তীরবর্তী কটিয়াদী পুরাতন বাজারের প্রেসক্লাবের বাছে ঢাকের হাট বসে।বাংলাদেশের আর কোথাও এ ধরনের বাদ্যযন্ত্রের হাট নেই বলে জানান আয়োজকরা।

 

বিক্রমপুরের ঢাকি সনকুমার (৩৫) বলেন,আমার বাপ-দাদারা এই হাটে আসতেন। আমিও এই ঢাকের হাটে ২০ বছর ধরে আসি। প্রত্যেকবারই বায়না হয়ে যায়। মুন্সিগঞ্জের ঢোল বাদক রতন দাস (৪৫) বলেন,অনেক আশায় থাকি দুর্গাপূজার এই ক’টা দিনের জন্য। এককালীন কিছু বেশি উপার্জন হয় এই দুর্গাৎসবের সময়। প্রতিবছর এই হাটে এসে বিভিন্ন মন্ডপে গিয়ে ঢোল বাজিয়ে আসছি।

 

কটিয়াদী উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি দিলীপ কুমার সাহা জানান, এই ঢাকের হাটে প্রতি বছর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ৪০০ থেকে ৫০০ ঢাকি ও বাদ্য বাদকরা আসে। এটি দেশের একমাত্র ঢাকের হাট।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জ্যোতিশ্বর পাল বলেন, পূজা আয়োজক ও আগত বাদ্যযন্ত্রিদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পরামর্শ দেয়া হয়েছে এবং তাদের নিরাপত্তার জন্য কটিয়াদী মডেল থানার ওসি এসএম শাহাদত হোসেন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। এছাড়া উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও তদারকি করা হবে। উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ডা. মোহাম্মদ মুশতাকুর রহমান বলেন, পাঁচশত বছরের ঐতিহ্যবাহী ঢাকের হাট কটিয়াদী উপজেলার ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা স্বাস্থ্যবিধি মেনে উদযাপনের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।