চুয়াডাঙ্গার ঐতিহ্য বাদুড়তলা, যতদিন তেঁতুল গাছ থাকবে ততদিন বাদুড় থাকবে

চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার পাশে ওয়াপদাপাড়ায় রয়েছে বাদুরতলা। ইবাদত আলি জোয়ার্দ্দার নামের এক ব্যাক্তি প্রায় ২শ বছর আগে এখানে বসবাস করতেন পরিবার নিয়ে। সে সময় জোয়ার্দ্দার ও মল্লিক বংশের লোকজনের বসবাস ছিল এখানে। ইবাদত আলি জোয়ার্দ্দারের সব সম্পত্তি দেখাশুনা করতেন তার বড় ছেলে ইউসুফ আলি জোয়ার্দ্দার।

 

ইউসুফ আলি জোয়ার্দ্দারের ছিল দুই মেয়ে সেলিমা খাতুন ও হাসিনা খাতুন। বাবা মারা যাওয়ার পর তার দুই মেয়ে বাদুরতলার সম্পিত্তির ভাগ পায় সাড়ে ৪ বিঘা করে জমি। সেলিমা খাতুন ৬ ছেলে ও ৩ সন্তান নিয়ে স্থায়ী ভাবে চুয়াডাঙ্গায় বসবাস করেন। আর হাসিনা খাতুন পরিবার নিয়ে থাকেন ঢাকায়। হাসিনা খাতুন তার সম্পত্তি গুলো বোনের ছেলে ও স্থানীয়দের কাছে বিক্রি করে দেন।

 

সেলিমা খাতুনের বড় ছেলে খোকন জোয়ার্দ্দার বলেন, ১৯২৫ সালে সর্ব শেষ বাদুড়তলায় ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে। নানা ও মায়ের মুখ থেকে বাদুড়ের গল্প শুনেছি। তারা বলতেন অনেক বছর ধরে বাগানে বাদুড় বসবাস করত। তাই গাছ গুলো কখনও কাটার চিন্তা করা হয়নি। বাগানে নানা ১৯৫১ সালে একটি মিল তৈরি করেন। ১৯৬০ সালে বেশ কয়েক দিন তাপদাহ পড়েছিল। তাপদাহের কারণে বাদুড় মরে যাচ্ছিল। নানা ভারত থেকে একটি পানি ছিটানোর জন্য মেশিন কিনে নিয়ে আসেন। সেই মেশিন দিয়ে বেশ কয়েক দিন পানি ছিটানো হলে বাদুড় গুলো প্রাণে রক্ষা পায়।

 

৯ বিঘা জমির উপর ছিল বাদুড়তলার বাগান। ১৯৯২ সালে আমার ছোট খালা কয়েকটি তেঁতুল গাছ কেটে ফেলে। আর দুটি গাছ মারা যায়। ছোট ভাইয়ের জমিতে চারটি তেঁতুল গাছ রয়েছে। সেখানে বাদুড় গুলো নিরাপদ আশ্রয়ে বসবাস করছে। গাছ গুলো দেড়শো বছরের বেশি বয়স হয়েছে। ২শ বছরের বেশি সময় ধরে বাদুড় রয়েছে। তেঁতুল গাছ যত দিন বেঁচে থাকবে বাদুড় গুলো ততদিন থাকবেবলে তিনি জানান ।

 

দুর থেকে শব্দ শুনে বুঝা যায় কাছা কাছি কোথাও অভয়ারণ্য রয়েছে বাদুড়দের। ২শ বছরের পুরনো বাদুড়দের নিজস্ব সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছে চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার পাশে ওয়াপদাপাড়ায়। অসংখ্য বাদুড় ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চিঁচিঁ শব্দে মুখরিত করে রাখে বাদুরতলা। দিনের বেলা বাদুড় গুলো ৪টি তেঁতুল গাছের ডালে ঝুলে থাকে আর এ ডাল থেকে ও ডালে ছুটে বেড়ায়। সন্ধ্যা হলেই খাবারের জন্য বেড়িয়ে পরে স্তন্যপায়ী প্রাণি গুলো। উদ্ভিদের পরাগায়নের জন্য কাজ করে বাদুড় গুলো। দুর-দুরন্ত থেকে সাধারণ মানুষ ছুটে আসে বাদুড় দেখতে। বাদুড়ের জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়েছে কোটি টাকার সম্পত্তি। স্থানীয়দের দাবি বিলুপ্ত প্রায় এ প্রাণি গুলো এখনই সংরক্ষণ করা না গেলে হারিয়ে যাবে। উপজেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা বলেন, এ প্রজাতির প্রাণি গুলো এখনই সংরক্ষণ করতে সবাইকে সম্মিলিত ভাবে উদ্যোগ নিতে হবে।

 

সেলিমা খাতুনের ৬ ছেলে ও ৩ মেয়ে পান চুয়াডাঙ্গা ওয়াপদাপাড়ার বাদুরতলার জমি। তারা বাদুড় গুলো সংরক্ষণের জন্য নানা মুখি উদ্যোগ গ্রহণ করেন। বাদুড়তলায় ১০টি তেঁতুল গাছসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ ছিল। প্রায় ২শ বছর ধরে বাদুড়রা গড়ে তুলেছে নিজস্ব সা¤্রাজ্য তেঁতুল গাছ গুলোতে।

১৯৯২ সালে হাসিনা খাতুন তার জমিতে থাকা কয়েকটি তেঁতুল গাছ কেটে ফেলেন। আর দুটি গাছ মরে যায়। বর্তমানে বড় চারটি তেঁতুল গাছে বাদুড় গুলো বসবাস করে।

 

প্রায় ২শ বছর ধরে বাদুড়ের বসবাস চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার পাশে ওয়াপদাপাড়ায়। সেলিমা খাতুনের কয়েক ছেলের রয়েছে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বসবাস। মেজো ছেলে মধু জোয়ার্দ্দারের জমির মধ্যে পড়েছে ৪টি তেঁতুল গাছ। গাছ গুলোতে রয়েছে বাদুড়ের নিরাপদ আশ্রায়। সে কথা চিন্তা করেই গাছ চারটি না কেটে মধু জোয়ার্দ্দার ৩ কাঠা জমি ছেড়ে দেন। বর্তমানে এ জমির মূল্য এক কোটি টাকার বেশি। চারটি তেঁতুল গাছে প্রায় ৩ হাজার বাদুড় বসবাস করে। তেঁতুল গাছ থেকে তেঁতুল পারা হয়না, শুধু তাদের খাবারের জন্য রাখা হয় বছরের পর বছর। গাছের ডালে ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঝুলে থাকে। পা ডালের সাথে বাদিয়ে দিয়ে মাথা নিচের দিকে দিয়ে ঝুলে।

দিনের বেলা স্তান্যপায়ি প্রাণি গুলো চোখে দেখতে না পারায় গাছের ডালে ঝুলে থাকে, আর এ ডাল থেকে সে ডালে ছুটে বেড়ায়। সন্ধ্যা হওয়ার সাথে সাথে বাদুড় গুলো খাবারের জন্য ঝাঁকে ঝাঁকে ছুটে যায় দুর-দুরন্তে। খাবার খেয়ে ভোরের আলো ফুটার আগেই ফিরে আসে নীড়ে।

বাদুড়ের বসবাসের কারণে এ এলাকার নামকরণ হয়েছে বাদুড়তলা নামে। স্থানীয়রা বাদুড়তলা নামে চেনেন স্থানটি। বাদুড়ের নামে বাদুড় মার্কা আটা, ময়দা, সুজি ও ভূসির নামকরণ করা হয়েছে। চুয়াডাঙ্গাসহ পার্শবর্তী জেলার বাজারে বাদুড় মার্কা পণ্য গুলোর চাহিদা রয়েছে অনেক।

বিলুপ্ত এ প্রাণিটি দেখতে দুর-দুরন্ত থেকে সব বয়সের মানুষ ছুটে আসেন। বাদুড়ের অবাদ বিচরণ দেখে তারা মুগ্ধ হন। এ প্রাণিটি তেমন একটা দেখা যায় না। ছোট বাচ্চারা বাবা-মায়ের সাথে বারবার আসে স্তন্যপায়ি এ প্রাণিটি দেখতে। কারও ধারনা বাদুড় নিপা ভাইরাস ছড়ায়। কিন্তু যারা বাদুড়ের সাথেই বসবাস করেন তারা বলেন এখনও পর্যন্ত বাদুড় থেকে কোন ভাইরাস ও রোগ ছড়ায়নি।

মেহেরপুর জেলার বাজারপাড়ার বাসিন্দা রাশেদুজ্জামান জানান, অনেকের মুখে গল্প শুনেছি বাদুড়ের। তাই দেখতে ছুটে আসলাম বাদুড়তলায়। বাদুড়ের ডাক শুনে আমি মুগ্ধ। এত বাদুড় এক সাথে কখনও দেখেনি আগে।

চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকার পৌর এলাকার বিশিষ্ট রাজনৈতিক,সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব তোহিদ হোসেন বলেন, ছোট বেলা থেকে গাছে বাদুড় দেখছি। সকালে ঘুম ভাঙার পর বাদুুড়ের চিঁচিঁ শব্দ শুনতাম। বাদুড় এক সাথে আকাশে উড়তো। বাদুড় গুলো চুয়াডাঙ্গার ঠিকানে এনে দিয়েছে। রাতে খাবার খেয়ে দিনে সারা বেলা গাছে থাকতো। বর্তমান পরিবেশে বাদুড় গুলো টিকে থাকার লড়াই করছে। তেঁতুল পাড়তে গিয়ে তাদের অনেক কাছে যেতাম।

জমির মালিকের আর এক ভাই জাহিদ মিয়া জানান, প্রাণী গুলো নিজের সন্তানের মত। তাদের উপর দরদ ও ভালবাসা জন্মেছে। নিরীহ প্রাণী গুলো দ্বারা কোন ক্ষতি হয়নি। প্রাণী গুলো বাঁচিয়ে রাখার জন্য জমি ছেড়ে দিয়েছি। আমার সন্তানদের বলেছি বাদুড়ের পুরাতন আবাসস্থল নষ্ট না করার জন্য।

 

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন চুয়াডাঙ্গা জেলা শাখার সভাপতি অধ্যক্ষ সিদ্দুকুর রহমান জানান, বাদুড় স্তন্যপায়ী প্রাণী। দিনে গাছে থাকে, রাতে খাদ্যর জন্য বিচরণ করে। পৃথিবী থেকে অনেক প্রাণী বিলুপ্ত হয়েছে। বাদুড় দেশ থেকে বিলুপ্তির আগে সংরক্ষণ করতে হবে। পরিবেশ সংরক্ষণে বাদুড়ের ভূমিকা রয়েছে। বাদুড় নিয়মিত বাচ্চা দেয়।

চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা ডা. এএইচএম শামিমুজ্জামান বলেন, মধু মিয়া একজন প্রাণী প্রেমীক ব্যক্তি। বাদুড় থেকে নিপা ভাইরাস ছড়ায় এমন তথ্য জেলায় নেই। চারটি তেঁতুল গাছে প্রায় ৩ হাজার বাদুড়ের নিরাপদ আশ্রয়ে রয়েছে। বিলুপ্ত প্রাণীটি সংরক্ষণ হচ্ছে। বাদুড় ফল খেয়ে বেঁচে থাকে। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করে। বাদুড়ের মাধ্যমে খুব সহজে পরাগায়ন হচ্ছে উদ্ভিদের। বাদুড় বীজ ফেলে অথবা ফল মুখে করে নিয়ে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ফেলে দেয়। বিরল প্রজাতির উদ্ভিদের বংশবিস্তার সম্ভব।