চুয়াডাঙ্গায় ফিলিপাইনের কালো আখ চাষে কৃষকদের ভাগ্যবদল

বাণিজ্যিক ভাবে চুয়াডাঙ্গায় চাষ হচ্ছে ফিলিপাইনের কালো জাতের আখ। বাজারে এ জাতের আখের চাহিদা থাকায় কৃষকরা চাষে আগ্রাহ দেখাচ্ছেন। প্রতি বছর আখ চাষ ছড়িয়ে পড়ছে জেলায়। অন্য ফসলের চেয়ে আখ চাষ লাভজনক। খরচ বাদে প্রতি বিঘায় লাভ প্রায় দেড় লাখ টাকা। আখ খেতে মিষ্টি, রসালো ও নরম। বাজারে প্রচলিত আখ থেকে ভিন্ন হওয়ায় ক্রেতাদের কাছে চাহিদা বেশি। আখ লম্বায় বড় হওয়ায় বাঁশের মাচা দিতে হয়। প্রতি পিচ আখ বিক্রি হচ্ছে ৫০-৬০ টাকা দরে। চুয়াডাঙ্গায় আখের চাহিদা মিটিয়ে অন্য জেলা থেকে ক্রেতারা মাঠ থেকে আখ কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।

 

চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার শঙ্করচন্দ্র ইউনিয়ানের দিননাথপুর গ্রামের কৃষক হারিছ চৌধুরি ২০১৮ সালে সর্ব প্রথম ফিলিপাইনের কালো জাতের আখ চাষ করেন। তিনি চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা কৃষি অফিসের মাধ্যমে এ জাতের আখের চারা পান। তিনি প্রথমে তিন কাঠা জমিতে পরীক্ষা মূলক ভাবে আখ চাষ করেন। ফলন, আখের মান ভাল, বাজরে চাহিদা ও লাভজনক হওয়ায় পরের বছর সাড়ে চার বিঘা জমিতে চাষ করেন। তিনি আখের চারা তৈরি করে জেলার অন্য কৃষকদের কাছে বিক্রি করেন। অনেক কৃষক আখ চাষে আগ্রাহ দেখাচ্ছেন। প্রতি পিচ আখের চারা ২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে কৃষকরা চারা নিয়ে যাচ্ছেন।

 

এক বিঘা জমিতে আখ চাষের জন্য ২৫০০ চারা রোপন করতে হয়। এখান থেকে প্রায় ৯-১০ হাজার পিচ আখ পাওয়া যায়। একটি আখ গাছ থেকে ৯-১১টি আখ পাওয়া যায়। আখ চাষ করতে হয় উচুঁ জমিতে। জমি ভাল ভাবে চাষ দিতে হয় প্রথমে। তারপর লম্বা লম্বা সারি করে আখের চারা রোপন করতে হয়। নিয়মিত আখ ক্ষেত পরিচর্যা করতে হয়। রোগ বালাই তুলনা মূলক কম। আখ রোপনের ১০ মাস পর বাজারে বিক্রির উপযুক্ত হয়।

বর্তমানে চুয়াডাঙ্গার চারটি উপজেলায় ১শ বিঘা জমিতে আখ চাষ হচ্ছে। আখ চাষ লাভজনক হওয়ায় কৃষকরা আগ্রাহ দেখাচ্ছেন। গাছ লাগানোর পর একটি আখ লম্বায় ১৫-২০ ফুট হয়। আখ ভেঙে না যায় সে জন্য বাঁশ, সুতা ও তাঁর দিয়ে মাচা তৈরি করতে হয়। মাচা না দিলে ঝড় ও বাতাসে ভেঙে যাওয়ার সম্ভবনা বেশি। প্রতি পিচ আখ বিক্রি হচ্ছে ৫০-৬০ টাকায়। ১শ বিঘা জমি থেকে এ মৌসুমে প্রায় ৯ লাখ পিচ আখ উৎপাদন হবে। আখ রসালো হওয়ায় বাজারে চাহিদা ব্যাপক। আখ খেতে মিষ্টি, রসালো ও নরম। আখ লম্বায় অনেক বড় ও মোটা।

আখের গায়ের রঙ কালো হলেও ভেতরের রঙ সাদা। আখ পুষ্টিকর খাবার হওয়ায় চাহিদা রয়েছে ক্রেতা-বিক্রেতার কাছে। প্রতি বিঘা জমিতে আখ চাষে প্রায় ১ লাখ টাকা খরচ হয়। খরচ বাদে প্রতি বিঘায় লাভ হয় দেড় লাখ টাকা প্রায়।

আখ ক্ষেতের শ্রমিক আরশেদ বাবু বলেন, হারিছের আখ ক্ষেতে নিয়মিত কাজ করি। আগাছা পরিস্কার,পাতা কাটা, সার ও কীটনাশক ছিটায়। দিন হাজিরা ৩শ টাকা পায়।

 

চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার শঙ্করচন্দ্র ইউনিয়ানের দিননাথপুর গ্রামের আখ চাষি হারিছ চৌধুরি বলেন, প্রথমে অল্প জমিতে এ জাতের আখ চাষ করি। আখের ফলন ভাল হওয়ায় চাষে আগ্রাহ দেখায়। বড় পরিসরে আখ চাষ করার জন্য নিজেই চারা তৈরি করে সাড়ে ৪ বিঘা জমিতে এ মৌসুমে আখ লাগায়। ৬ লাখ টাকা লাভ হতে পারে। আখ চাষ দেশে ছড়িয়ে দিতে চারা উৎপাদন করছি।

 

চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকার বুজরুকগড়গড়ি গ্রামের আখ চাষি সোহান আলি জানান, দুই বিঘা জমিতে ফিলিপাইনের কালো জাতের আখ চাষ করছি। আখের চারার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে অন্য কৃষকদের কাছে। আখ চাষ লাভজনক। নতুন উদ্যোক্তারা আখ চাষ করে স্বাবলম্বী হতে পারবে।

 

চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার বোয়ালমারী গ্রামের কৃষক মিলন হোসেন বলেন ,লাভজনক জেনে তিনি দুই বছর আগে চুয়াডাঙ্গা দিননাথপুর হারেস মিয়ার কাছ থেকে উচ্চমুল্যে আখবীজ সংগ্রহ করেন । একবিঘা জমি লিজ নিতে ১৬ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। শিয়ালের হাত থেকে আখ বাঁচাতে তারের নেট কিনতে হয়েছে। এছাড়া বাঁশ ক্রয় ও লেবার সহ তার মোট খরচ হয়েছে প্রায় এক লাখ টাকা । তিনি জানান ,কার্তিক মাস আখ চাষের উপযুক্ত সময় । পুরো এক বছর সময় লাগে আখ চাষে। প্রথম বছর আখ কাটার পর প্রায় ৫০ হাজার টাকা খরচ করলে আরও এক বছর আখ পাওয়া যায় ।

দৈনিক শেয়ার বিজের চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি সাংবাদিক মফিজ জোয়ার্দ্দার বলেন, ১ বিঘা জমিতে এ বছর আখ চাষ করবো। চারা তৈরি করার জন্য ১৩০টি ফিলিপাইনের কালো জাতের আখ কিনে আনলাম দিননাথপুর গ্রাম থেকে। ৫০ টাকা করে প্রতি পিচ আখের দাম। অন্য ফসল চাষ লাভজনক না হওয়ায় আখ চাষ করবো।

 

ঢাকা সাভারের আখ ক্রেতা জলিল ব্যাপারি বলেন, চুয়াডাঙ্গায় কালো জাতের আখ বাজারে বিক্রি হচ্ছে। বাজারে চাহিদা রয়েছে অনেক। ৩ হাজার পিচ আখ কিনে ট্রাক যোগে সাভারে নিয়ে আসলাম। প্রতি পিচ আখ ২৫-৩০ টাকা লাভে বিক্রি করতে পারবো। কারণ আখ গুলো অনেক লম্বা ও মোটা।

 

চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা সুফি মো: রফিকুজ্জামান বলেন, চুয়াডাঙ্গায় কৃষকরা নতুন ফসল চাষে আগ্রাহী। ফিলিপাইনের কালো জাতের আখ চাষ হচ্ছে। চিবিয়ে খাওয়ার মত একটি আখ। আখ চাষ বৃদ্ধি পাচ্ছে। উচুঁ জমিতে এ জাতের আখ চাষ করলে ফলন ভাল হয়। কৃষকরা আর্থিক ভাবে লাভবান হচ্ছে। কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহযোগিতা করা হচ্ছে।